অশাতমন্ত্র জাতক । ত্রিরত্ন ডট কম

অশাতমন্ত্র জাতক । ত্রিরত্ন ডট কম

অশাতমন্ত্র-জাতক (অশাত = অমঙ্গল)। এর শুরু হচ্ছে এইভাবে, “শাস্তা জেতবনে জনৈক উৎকন্ঠিত ভিক্ষুকে … বলিলেন,

পুরাকালে বারাণসীতে বোধিসত্ত্ব এক বিখ্যাত গুরু হিসাবে জন্মেছিলেন। এক ব্রাহ্মণসন্তান তাঁর থেকে শিক্ষা নিয়ে বাড়ি ফিরে সংসারধর্ম শুরু করতে গেলে তার মা-বাবার মনে হয়, সংসার অনর্থের মূল, ছেলেকে সন্ন্যাস নেওয়াতে হবে। এবং তার মনে বৈরাগ্য জন্মাতে হবে স্ত্রীচরিত্রের দোষ দেখিয়ে। তখন তার মা তাকে বলে, ‘বাছা, তুমি অনেক বিদ্যা শিখলেও অশাতমন্ত্র নিশ্চয়ই শেখ নি। যাও, গুরুর কাছে ফিরে তা শিখে এস।’

বোধিসত্ত্ব শুনে বুঝলেন, অশাতমন্ত্র নামে বাস্তবে তো কোনো মন্ত্র নেই, নিশ্চয়ই এর মা তাকে স্ত্রীচরিত্রের দোষ শেখাতে চান। তা তখন তাঁর ১২০ বছর বয়সী বিধবা মা তাঁর কুটিরেই বাস করতেন, বৃদ্ধা জরাগ্রস্তা দৃষ্টিশক্তিহীনা মাকে তিনি নিজে হাতেই সেবাযত্ন করতেন। তখন শিষ্যকে তাঁর সেবার ভার দিলেন, আর বললেন, নিয়মিত তাঁকে সেবা করার সময় তাঁর রূপের প্রশংসা করবে। মা যা বলেন, শুনে এসে আমাকে বলবে।

“স্ত্রীজাতি এতই অসতী, হেয়া ও নীচাশয়া যে এত অধিকবয়স্কা বৃদ্ধাও কামভাবের বশবর্তী হইয়া” সেই তরুণের প্রতি ঢলে পড়লেন, এবং বললেন, যে আমিও তোমার প্রতি আসক্ত হয়েছি, কিন্তু আমার ছেলে খুব কঠোর স্বভাবের, তাই তাকে আমার ভয় হয় – তুমি তাকে মেরে ফেল, তাহলেই আমাদের মিলন হবে। শিষ্য গুরুকে হত্যা করতে অস্বীকার করলে তিনি বললেন, তুমি ব্যবস্থা কর, আমি নিজে হাতেই তাকে বধ করব।

এরপর বোধিসত্ত্ব নিজের বিছানায় নিজের এক কাঠের মূর্তি শুইয়ে শিষ্যকে বললেন, সে বৃদ্ধাকে গিয়ে খবর দিল। বৃদ্ধা কাঁপতে কাঁপতেই কুঠার হাতে গিয়ে তাতে আঘাত করলেন, কিন্তু কাঠের শব্দে বুঝতে পারলেন যে তিনি প্রতারিত হয়েছেন। তখনই তাঁর মৃত্যু হল। এই ঘটনা দেখিয়ে বোধিসত্ত্ব শিষ্যকে ব্যাখ্যা করলেন, যে নারীজাতির অসতীত্বই অশাতমন্ত্র।

তথ্যসুত্রঃ মুক্ত মনা

বি.দ্রঃ সদ্ধর্ম প্রচারে আমাদের সাথে থাকুন । আপনার বৌদ্ধ ধর্মীয় লেখা প্রচার করতে যোগাযোগ করুন আমাদের হটলাইন নাম্বার এ । ধন্যবাদ ।

তক্ক জাতক । ত্রিরত্ন ডট কম

তক্ক জাতক । ত্রিরত্ন ডট কম

 তক্ক-জাতক এর মরাল হল, “স্ত্রীজাতি অকৃতজ্ঞ ও মিত্রদ্রোহী”। –

বারাণসীতে এক ব্যবসায়ীর এক বদমেজাজি মেয়ে ছিল, নাম দুষ্টকুমারী। সে তার দাসীদের খুব অত্যাচার করত। তাই একদিন গঙ্গায় নৌকা করে বেড়াবার সময় দারুণ ঝড় উঠলে দাসীরা তাকে ঠেলে ফেলে দিয়ে ফিরে এসে বলে, কুমারী ডুবে গেছেন।

এদিকে বোধিসত্ত্ব নদীতীরে কুটির বানিয়ে তপস্যা করতেন, তিনি মেয়ের চিৎকার শুনে তাকে উদ্ধার করে আনলেন। মেয়েটি তাঁকে দেখে ভাবল, “প্রণয়পাশে আবদ্ধ করিয়া এই তপস্বীর চরিত্রভ্রংশ ঘটাইতে হইবে।” তার প্রেম-ছলনায় ভুলে তিনি সত্যিই সাধনা ছেড়েছুড়ে তাকে বিয়ে করে এক গ্রামে গিয়ে বসত করলেন। কিন্তু অচিরেই তাঁর অনুপস্থিতিতে গ্রামে ডাকাত পড়ল, ডাকাতসর্দার মেয়েটিকে লুঠ করে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করল। কুমারী ভাবল, আমি এখানে খুবই সুখে আছি, কিন্তু আমার আগের স্বামী আমায় খুঁজতে এখানে চলে এলে গণ্ডগোলের সম্ভাবনা। তাই তাঁকে এখানে আনিয়ে খুন করাতে হবে। সে একজনকে দিয়ে খবর পাঠাল, বোধিসত্ত্ব সেখানে এলে তাঁকে খাইয়েদাইয়ে লুকিয়ে রাখল, বলল আমরা রাত্রে পালাব। এদিকে সন্ধ্যায় ডাকাতসর্দার এলে সে তাঁকে ধরিয়ে দিল, অনেক মেরেধরে সর্দার তাঁকে ঝুলিয়ে রাখল। সারারাত তিনি “অহো! কি নিষ্ঠুরা, কি অকৃতজ্ঞা, …” বলে আর্তনাদ করতে লাগলেন। সেই শুনে সকালে সর্দার ভাবল, এ লোক “মাগো বাবাগো” না বলে এইসব বলে কেন? ঘটনা জিজ্ঞাসা করলে তিনি সব শোনালেন। তাতে সেও নারীজাতির সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করে কুমারীকে দুটুকরো করে ফেলল, আর বোধিসত্ত্বের সাথে মিলে তপস্যা করতে চলে গেল।

জাতকসুত্রঃমুক্ত মনা

বি.দ্রঃ সদ্ধর্ম প্রচারে আমাদের সাথে থাকুন । আপনার বৌদ্ধ ধর্মীয় লেখা প্রচার করতে যোগাযোগ করুন আমাদের হটলাইন নাম্বার এ । ধন্যবাদ ।

অশাতমন্ত্র জাতক । ত্রিরত্ন ডট কম

ভেরীবাদক জাতক – ত্রিরত্ন ডট কম

বারাণসীরাজ ব্ৰহ্মদত্তের সময়ে বােধিসত্ত্ব একবার ভেরীবাদকের বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি এক গ্রামে বাস করতেন। তিনি তাঁর পুত্রসহ ভেরী বাজিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। একদিন বােধিসত্ব শূনতে পেলেন, বারাণসী নগরে কোন পর্ব উপলক্ষে এক বড় উৎসব হবে। মহা সমারােহ হবে নগরে। বহু লােকসমাগম হবে। সমাগত লােকদের কাছে ভেরী বাতালে বেশ কিছু অর্থ পাওয়া যেতে পারে। এই ভেবে তিনি পুত্রসহ ভেরী নিয়ে উৎসবস্থানে চলে গেলেন। সেদিন নগরে ভেরী বাজিযে অনেক ধন লাভ করলেন। বােধিসত্ব। উৎসব শেষ হলে তিনি সেই ধন নিয়ে বাড়ির পথে যাত্রা করলেন। পথে এক বন ছিল। সেই বনে এক দস্যুদল ছিল। | বনের মধ্যে পখিকদের পেলেই তারা উপদ্রব করত। বােধিসত্বের পুত্র সেই বনের মধ্য দিয়ে যাবার সময় একটানা ভেরী বাজিযে চলল। সে ভাবল, এইভাবে ভেরী বাজালে, ভেরীর শব্দ শুনে দস্যুরা পালিয়ে যাবে। কিন্তু বােধিসত্ব ভার ছেলেকে বললেন, এভাবে | একটানা বাজিও না। মাঝে মাঝে বাজাও। ভেরীর শব্দ শুনে দস্যু সত্যিই পালিয়ে গেল। কারণ তারা ভাবল, হ্যত রাঙ্গ বা কোন বিশিষ্ট ধনী ব্যক্তি বহু লােকজন নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা যখন দেখল, একটানা ভেরী বেজে চলেছে, তখন তারা ভয় করল না। ভারা সাহস করে এগিয়ে দেখল মাত্র দুজন লােক যাচ্ছে। দস্যরা তখন বােধিসত্ত্ব ও তাঁর ছেলেকে মারধর করে সব ধন কেড়ে নিল। বােধিসত্ত্ব হায় হায় করতে লাগলেন। বললেন, বহু কষ্ট যে ধন উপার্জন করলাম, দসরা এক নিমেষেই তা কেড়ে নিল। ভারপর তিনি পুত্রকে বললেন, কোন বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। আমি তােমাকে একটানা করেছিলাম। কিন্তু তুমি আমার কথা না | ভেরী বাজাতে নিষেধ শুনে বিস্তর ভেরী বাজিযে বিপদ ডেকে আনলে।।

চরিত্রপরীক্ষা জাতক

চরিত্রপরীক্ষা জাতক

ঐ আচার্যের এক প্রাপ্ত বয়স্কা কন্যা ছিল। আচার্য ঠিক করলেন, আমার এই শিষ্যগণের চরিত্র পরীক্ষা করে যাকে সর্বাপেক্ষা চরিত্রবান দেখব, তাকেই আমি কন্যা সম্প্রদান করব। তারপর একদিন আচার্য তাঁর শিষ্যদের ডেকে বললেন, বৎসগণ, আমার কন্যা এখন বিবাহ যোগ্য হয়েছে। তার এখন বিয়ে দিতে হবে। তার জন্য বস্ত্র ও অলঙ্কার দরকার। তোমরা এমনভাবে বস্ত্র ও অলঙ্কার অপহরণ করে আনবে যাতে তোমার আত্মীয়বন্ধুগণ দেখতে না পায়। পরের অগোচরে যা আনবে তাই আমি গ্রহন করব। অপহৃত বস্তু অপরে যদি দেখতে পায় তাহলে আমি গ্রহন করব না।

শিষ্যরা এই প্রস্তাবে সম্মত হয়ে আত্মীয়বন্ধুদের অগোচরে বস্ত্র ও অলঙ্কার অপহরণ করে এনে আচার্যকে দিতে লাগল। কিন্তু বোধিসত্ত্ব কিছুই আনলেন না।

তখন আচার্য একদিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, বৎস তুমি আমাকে কিছুই এনে দিলে না?

তখন বোধিসত্ত্ব বললেন, না গুরুদেব, আমি কিছুই আনতে পারি নি।

আচার্য জিজ্ঞাস করলেন, কেন আনতে পারনি?

বোধিসত্ত্ব উত্তর করলেন, আপনি বলেছেন, অপহৃত দ্রব্য অপরে দেখতে পেলে আপনি তা গ্রহন করবেন না।
তারপর একটি গাথার মাধ্যমে তিনি বললেন, অপহরণ হচ্ছে একটি পাপকর্ম। কোন পাপ কর্মের অনুষ্ঠান গোপনে হতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না। যারা মুর্খ্য তারাই বলে, আমি গোপনে এই পাপ করেছি। কারণ প্রাণী শূন্যস্থান কোথায় আছে? দৃশ্য বা অদৃশ্য কোন না কোন প্রাণী সর্বত্রই আছে।

বোধিসত্ত্বের কথা শূনে আচার্য অতীব সন্তুষ্ট হলেন। তিনি বললেন, আমার ঘরে ধগনের অভাব নেই। আমি আমার শিষ্যদের চরিত্র পরীক্ষা করার জন্যই এ কথা বলেছিলাম। এখন দেখছি, একমাত্র তুমিই চরিত্রবান শিষ্য এবং আমার কন্যা তোমার উপযুক্তা।

তারপর আচার্য বোধিসত্ত্বকেই কন্যা সম্প্রদান করলেন এবং অন্যান্য শিষ্যদের আনা সমস্ত বস্ত্র ও অলঙ্কার তাদের হাতে ফিরিয়ে দিলেন।

সুত্র ঃ জাতকসমগ্র

নামসিদ্ধী  জাতক

নামসিদ্ধী জাতক

পুরাকালে বােধিসত্ত্ব তক্ষশিলা নগরে একজন বিখ্যাত আচার্য ছিলেন। পাঁচশতশিষ্য তাঁর বিদ্যাভ্যাস করত। এই সব ছাত্রদের মধ্যে একজনের নাম ছিল পাপক। অন্যান্য ছারা তাকে সব সময় ‘এস পাপক’, যাও পাপক বলত। তাতে পাপক চিন্তা করতে লাগল, আমার নাম অমঙ্গল সূচক। অতএব আমি অন্য একটি নাম গ্রহণ করব। পাপক তাই আচার্যের কাছে গিয়ে বলল, গুরুদেব, আমার বর্তমান নামটা অমঙ্গলসূচক। আমার অন্য একটি নাম রাখুন। আচার্য বললেন, যাও, তুমিজনপদে গিয়ে ঘুরে একটা মঙ্গল সূচক নাম ঠিক করে এস। তুমি ফিরে এলে তােমারবৰ্তমান নামটা পরিবর্তন করে অন্য নাম রাখব। পাপক তখন যাত্রা শুরু করল। সে গ্রামে গ্রামে ঘুরে একটি নগরে গিয়ে উপস্থিত হলাে। সেই নগরে জীবক নামে একৰ্তি লােকের মৃত্যু হয়েছিল সেদিন। সুতি কুলগণ তার সৎকারের জন্য তার মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছে দেখে পাপক জানতে চাইল, এই লােকটির নাম কি ছিল?তারা বলল, এর নাম ছিল জীবক। পাপক তখন আশ্চর্য হয়ে বলল, সেকি! জীবক মানেই ত যে দীর্ঘজীবি। সেই জীবকেরও মৃত্য হলাে। তখন সেই শবযাত্ররা বলল, জীবকেরও মৃত্যু হয়, অনীকেরও মৃত্যুহয়। মরা বাঁচা কি নামের উপর নির্ভর করে নাম তাে কোন বস্তু বা ব্যক্তিকেছেনার বা জানার একটা উপায়। তুমি ত দেখছি বড় মােটা বুদ্ধির লােক।এই কথা শুনে পাপক তা নাম সম্বন্ধে মধ্যমভাব অবলম্বন করল। অর্থাৎ তার নামের উপর বিরক্তি বা অনুরক্তি রইল না। পাপক এবার নগরের ভিতরে গিয়ে দেখল একটি বাড়ির দরজায় এক দাসীকে এক প্রভু ওপ্রভুপত্নী দড়ি দিয়ে প্রহার করছে।পাপক তখন সেই দাসীর প্রভুর কাছে জানতে চাইল, আপনারা একে প্রহার করছেন কেন? প্রভু তখন বলল, এই দাসী আজকের উপার্জনের টাকা পয়সা কিছু আনেনি। পাপক তখন জানতে চাইল, এর নাম কি? দাসীর প্রভু বলল, এর নাম ধনপালী। পাপক আশ্চর্য হয়ে বলল সেকি! এর নাম ধনপালী, অথচ এর একদিনের বেতন দেবার ক্ষমতা নেই। তারা বলল, নাম ধনপালী হােক, বা অধনপালী হােক, তা কি অদৃষ্টিকে এড়াতে পারে? নামে কি আসে যায়?নাম শুধু ব্যক্তি কে, এই পরিচয় পাওয়া যায়। তুমি দেখছিঅতি স্কুলবুদ্ধি। এই কথা শুনে পাপক তা নিজের নাম সম্বন্ধে আগেরবিদ্বেষ ভাব ত্যাগ করল। সে নগর হতে বাইরে গিয়ে পথ চলতে লাগল।কিছুদূরগিয়ে সে দেখল, একটি লােক পথ হারিয়েছে। পাপক তার কাছে জানতে চাইল, আপনি কি করছেন? লােকটি বলল, আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি, তাই পথ খুঁজছি। পাপক তার কছে নাম জানতে চাইল।। লােকটি বলল, আমার নাম পন্থক। পাপক একথা শুনে আশ্চার্য হয়ে ভাবল, পন্থক মানে যে অপরকে পথ দেখায়।তাই সে বল্ল, সেই! যে পন্থক সে পথ হারায় কি করে? লােকটি বলল, পন্থক হােক অপন্থকই হােক সব লােকই পথা হারায়। নামে কি আসে যায়?নাম শুধু কোন ব্যক্তি কে, এই পরিচয় জানা যায়। তােমার বুদ্ধি ত দেখছি খুবমােটা। এবার পন্থক নিজের নাম সম্বন্ধে সম্পূর্ণ রূপে বিদ্বেষ ইন হলাে। সে আচার্যের কাছে ফিরে গেল।আচার্য তাকে জানতে চাইল, কি বতস নাম নির্বাচনকরে এলে? পাপক বলল, গুরুদেব , যার নাম জীবক সেও মরে, যার নাম অজীবক, সেও মরে।যার নাম ধনপালী সেও দরিদ্র হয় আর যার নাম অধনপালী সেও দরিদ্ৰহয়।যার নাম পন্থক সেও পথ হারায়, যার নাম অপন্থক সেও পথ হারায়।নামে কিআসে যায়? এখন দেখছি নামের কোন সারবত্তা নেই।নামদ্বারা কোন বস্তু বাব্যক্তি দে কি তা শুধু জানা যায়। নামে সিদ্ধি লাভ হয় না।সিদ্ধিলাভের উপায় হলাে কর্ম। অতএব আমার অন্য নামের প্রয়ােজন নেই।আমার যে নাম আছে তাই থাকুক।পপকের সব কথা শুনে বােধিসত্ত্ব এই উপদেশ দান করলেন যে, নামে কিছু আসে যায়না।একমাত্র সিদ্ধিদাতা হচ্ছে কর্ম- এই সত্য যেন সবাই মনে রাখে।

সুত্র ঃ জাতকসমগ্র

দেবধর্ম  জাতক

দেবধর্ম জাতক

পুরাকালে বারাণসি নগরে ব্রম্মদত্ত নামে এক রাজা ছিলেন। বোধিসত্ত্ব সেই রাজার পুত্ররূপে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর নাম হল মহীসাস কুমার।

বোধিসত্ত্বের বয়স যখন দুই কি তিন, তখন তাঁর এক সহদরের জন্ম হয়। সেই কুমারের নাম রাখা হল চন্দ্র কুমার। পরে চন্দ্রকুমারের বয়স যখন দুই তিন বছর হল তখন মহিষীর প্রাণ বিয়োগ হয়। পরে রাজা আবার বিবাহ করলেন। তখন তাঁর নতুন মহিষী জীবনসর্বস্ব হয়ে উঠল তাঁর।

কিছুকাল পর এই মহিষী একটি পুত্র সন্তান প্রসব করলেন। এই পুত্রের নাম রাখা হলো সূর্যকুমার। রাজা নব কুমার লাভ করে অতিমাত্রায় আনন্দিত হলেন। তিনি মহিষীকে বললেন, তুমি এই পুত্রের জন্য জে বর চাইবে আমি তাই দেব।

কিন্তু মহিষী তখন কোন বর চাইলেন না। তিনি বললেন, মহারাজ যখন প্রয়োজন হবে, তখন আপনাকে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেব।
যথাকালে সূর্যকুমার বয়ঃপ্রাপ্ত হল। তখন একদিন মহিষী রাজাকে বললেন, এই বালকের যখন জন্ম হয় তখন আপনি একে একটি বর দিতে চেয়েছিলেন। এখন সে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছে। অতএব একে এখন রাজপদ দান করুন।

রাজা বললেন, আমার প্রথম দুই পুত্র রাজপদের উপযুক্ত। তারা জলন্ত অগ্নির মত তেজস্বী। আমি তাদের ত্যাগ করে তমার পুত্রকে রাজ্য দিতে পারি না। কিন্তু মহিষী এতে ক্ষান্ত হলেন না। তিনি তাঁর প্রার্থনা পূরণের জন্য দিনরাত রাজাকে জ্বালাতন করতে লাগলেন। তখন রাজার আশঙ্কা হল মহিষী চক্রান্ত করে স্বপত্নিপুত্রদের প্রাণ নাশ করতে পারেন।

এই ভেবে রাজা মহিসাসকুমার ও চন্দ্রকুমারকে ডাকিয়ে বললেন, বৎসগণ, সুরজকুমারের যখন জন্ম হয় তখন আমি তোমাদের মাতাকে একটি বর দিতে চেয়েছিলাম, খন সেই বর তিনি নিতে চাননি, বলেছিলেন প্রয়োজন হলে নেব। এখন তিনি সেই দান চেয়ে তাঁর পুত্রকে রাজ্য দিতে বলেন। কিন্তু সূর্যকুমারকে রাজ্য দান করার একেবারে ইচ্ছে নেই আমার। কিন্তু স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী, তোমাদের বিমাতা হইত প্রাণ নাশ করার চেষ্টা করবেন। তাই বলছি তোমরা বনে গিয়ে আস্রয় গ্রহণ কর।

এরপর রাজা সজল চোখে বিলাপ করতে করতে তাঁর দুই পুত্রের মুখচুম্বন করে বনে পাঠালেন।

দুই রাজকুমার পিতাকে প্রনাম করে বনে যাওয়ার জন্য প্রাসাদ হতে বেরিয়ে গেলেন। সুরজকুমার তখন সেই উঠোনেই ছিলেন। তিনি তাঁর দাদাদের ভালবাসতেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে খুবই সদ্ভাব ছিল। তাঁর দাদাদের বনবাসের কারণ জানতে পেরে দুঃখিত হয়ে সূর্যকুমারও বনবাস করতে সংকল্প করলেন। তখন তিন ভাই একসঙ্গে বনবাসে গেলেন।

রাজকুমারগণ পথ চলতে চলতে হিমালয়ে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেখানে একদিন বোধিসত্ত্ব সুরজকুমারকে বললেন, ভাই ঐ সরবরে গিয়ে তুমি স্নান করে ও জল পান করে আমাদের জন্য পদ্মপাতায় করে কিছু জল আন।

পূর্বে ঐ সরোবর ছিল কুবেরের অধিকারে। কুবের উদক নামে এক রাক্ষসকে ঐ সরোবর দান করে বলে দিয়েছিলেন, দেবধর্মহীন কোন ব্যাক্তি এই সরবরে নামলেই তুমি তাকে ভক্ষন করবে। যারা জলে নামবে না তাদের উপর তোমার কোন অধিকার থাকবে না। সেই সরবরের জলে কেও নামলে উদক রাক্ষস থাকে জিজ্ঞেসা করত, দেবধর্ম কি? সে এর উত্তর দিতে না পারলে থাকে খেয়ে ফেলত।

সূর্য কুমার এইসব কথা জানত না। সে তাই নিঃশঙ্ক মনে জলে নামতেই উদক রাক্ষস তাকে ধরে জিজ্ঞেস করল, দেবধর্ম কাকে বলে জান কি?
সুরজকুমার বলল, জানি বৈ কি। লোকে সূর্য ও চন্দ্রকেই তো দেবতা বলে।

উদক বলল মিথ্যা কথা। তুমি দেবধর্ম জান না।

এই বলে সে সুরজকুমারকে গভীর জলে টেনে নিয়ে গিয়ে তাঁর ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখে দিল।

সূর্য কুমারের ফিরে আসতে বিলম্ব দেখে বোধিসত্ত্ব চান্দ্রকুমারকে তার খজে পাঠালেন। চন্দ্রকুমার সেই সরবরের জলে নামলে সেই উদক রাক্ষস তাঁকে ধরে সেই একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করল। চন্দ্রকুমার বললেন, দিকচতুষ্টয়ই অর্থাৎ চারটি দিক দেবধর্ম বিশিষ্ট।

রাক্ষস বলল, মিথ্যা কথা তুমি দেব্দরম জান না। এই বলে সে চন্দ্রকুমারকে গভীর জলে টেনে নিয়ে গিয়ে তার ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখে দিল।

চন্দ্রকুমারও ফিরে এলেন না দেখে বোধিসত্ত্ব ভাবলেন, দুই ভাইয়ের নিশ্চয় বিপদ হয়েছে। তিনি তখন তাদের সন্ধানে সেই সরবরে চলে গেলেন। তারপর পদচিহ্ন দেখে বুজতে পারালেন, তারা জলে নেমেছে, কিন্তু উঠে আসেনি। তখন বোধিসত্ত্ব বুঝতে পারলেন, এই সরবরে নিশ্চয় কোন জলরাক্ষস আছে। তাই তিনি মুক্ত তরবারি ও ধনুর্বাণ হাতে নিয়ে রাক্ষসের উপেক্ষায় তীরে দাঁড়িয়ে রইলেন।

উদক রাক্ষস তখন এক বনচরের বেশে সেখানে এসে বোধিসত্ত্বকে বলল, তুমি দেখছি পথশ্রমে ক্লান্ত। তুমি জল পান কর ও এই জলে স্নান করে ডেহ শীতল কর।

বোধিসত্ত্ব বুঝলেন, এই হল তিনি তখন রাক্ষস। তিনি তখন তাকে বললেন, তুমিই ত আমার ভাইদের ধরে রেখেছ?

বোধিসত্ত্ব আবার বললেন, কেন তাদের ধরে রেখেছ?

রাক্ষস বলল, কারণ তারা আমার ভক্ষ্য। যারা দেবধর্ম না জেনে এই সরবরেরে জলে নামে তারাই আমার ভক্ষ্য।
বোধিসত্ত্ব বললেন, দেবধর্ম কি তা শুনতে চাও?

রাক্ষস বলল, হ্যাঁ শুনতে চাই, বল।

বোধিসত্ত্ব বললেন, বলব বটে, কিন্তু পথশ্রমে বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।

উদক রাক্ষস তখহন তাঁকে স্নান করিয়ে খাদ্য ও পানীয় দ্বারা তৃপ্ত করল। তারপর একটি পর্যঙ্ক এনে তাঁকে দিল। তারপর সে তাঁর পদমূলে বসে দেবধর্ম শুনতে চাইল।

বোধিসত্ত্ব বললেন, যে ব্যাক্তি প্রসান্তচিত্ত, সত্যপরায়ণ, যে ব্যাক্তি নিয়ত অন্তরে সর্বদা ধর্ম রক্ষা করে চলে, যে ব্যাক্তি তার মনে কোন কুস্বভাব জাগলে যে মনে মনে লজ্জা পায়, তাকেই দেবধর্মবিশিষ্ট ব্যাক্তি বলে জানবে।

দেবধর্মের এই ব্যাখ্যা শুনে উদক রাক্ষস সন্তুষ্ট হলো। সে বলল তুমি সত্যিই জ্ঞানী। আমি তোমার একজন ভাইকে মুক্ত করে দেব। বল, তুমি তোমার কোন ভাইকে চাও?

বোধিসত্ত্ব বলল, আমার কনিষ্ঠ ভাই সূর্যকুমারকে মুক্ত করে আন।
রাক্ষস বলল, তুমি দেবধর্ম জান বটে, কিন্তু সেই মত কাজ কর না। জ্যেষ্ঠকে ছেড়ে, তুমি কনিষ্ঠকে বাঁচাতে চাও। এতে জ্যেষ্ঠের মর্যাদা রাখা হলো কি?

বোধিসত্ত্ব বলল, আমি দেবধর্ম আনুসারে কাজ করছি। কনিষ্ঠটি আমাদের বৈমাত্রয় ভাই। আমরা এর জন্য বনবাসী হতে বাধ্য হয়েছি। এর মাতা একে রাজ্য দান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের পিতা তাতে সম্মত হননি। তখন আমাদের প্রাণ নাশের আশঙ্কায় আমাদের বনে পাঠিয়ে দেন। এই কনিষ্ঠ ভাইটি তা জাতে পেরে সে স্বেচ্ছায় আমাদের সাথে চলে আসে সব কিছু ফেলে। সে রাজ্য চায় না, গৃহে ফিরে যেতে চায় না।

সে আমাদের ভালবাসে এবং আমাদের ভালবাসা চায়। তাছাড়া আমরা ফিরে গিয়ে যদি বলি, একে রাক্ষসে খেয়েছে, তা শুনে লোকে কি বিশ্বাস করবে? এই সব কারণে আমি কনিষ্ঠ ভাইকে মুক্ত করতে চাই।

রাক্ষস তখন বলল, সত্যিই তুমি দেব ধর্ম জান আর সেই মত কাজ কর। আমি তোমার দু ভাইকে মুক্ত করে দিচ্ছি।

বোধিসত্ত্ব তখন ভাইদের নিয়ে সেই বনে বসবাস করতে লাগলেন। তখন তিনি রাক্ষস্কে বললেন, তুমি তোমার কর্মদোষে বারবার রাক্ষসকূলে জন্মগ্রহণ করছ। তুমি জীবহিংসা কর নরমাংস ভক্ষণ করে এজন্মেও পাপ কাজ করছ। পরজন্মেও তুমি এরকম রাক্ষস হবে। এখন হতে তুমি এই রাক্ষসবৃত্তি ত্যাগ করে সৎ ও অহিংসা জীবন জাপন কর।

রাক্ষস তাই করল এবং তাঁদের কাছেই শুদ্ধভাবে বাস করতে লাগল।

এরপর বোধিসত্ত্ব নক্ষত্র গণনা করে দেখলেন তাঁর পিতা দেহত্যাগ করেছেন। তাই তিনি ভাইদের নিয়ে রাজবাড়ীতে ফিরে গিয়ে রাজ্যভার গ্রহন করলেন। চন্দ্রকুমারকে উপরাজ অর্থাৎ সহকারী রাজা করলেন এবং সূর্যকুমারকে প্রধান সেনপতি নিযুক্ত করলেন। এইভাবে তারা তিন ভাই রাজ্য শাসন করতে লাগলেন।

সুত্র ঃ জাতকসমগ্র

 

error: Content is protected !!