বড়ুয়াদের অনৈক্যের জন্ম কোথায়?

যেই গ্রামে বিহার যত
সেই গ্রামে বিভাজন তত।
যেই সমাজে নেতা যত,
সেই সমাজটি তত ক্ষত।
যাহা ঐক্য নাশে অবিরত।
প্রতিবন্ধক শত শত।

বর্তমানে বড়ুয়া সমাজে যে বিষয়টি বার বার পরিলক্ষিত হয় তা হল বিহার কমিটি, ভিক্ষু-গৃহীদের নেতৃত্বের বারাবারি। বিহার কমিটি আর দায়ক ভিক্ষু নিয়ে বর্তমানে প্রতিটি বৌদ্ধ গ্রাম দু-তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে । আগে প্রতিটি গ্রামে পূর্বপুরুষদের স্থাপিত বিহারগুলো ছিল সার্বজনীন। সেখানে ব্যাপক উৎসাহ আর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে গ্রামের সকলের উপস্থিতিতে সকল অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন হতো । কিন্তু সার্থান্বেষী নাম স্বর্বস ভিক্ষু ও গৃহীবাবুদের কবলে ক্রমেই সেই পূর্বপুরুষের ঐক্যতায় স্থাপিত বিহারগুলোতে চরম মতানৈক্য দেখা দেয় ও ভিন্ন একটি পক্ষের সৃষ্টি হয়। বংশ গৌরব আর মাতব্বরি ফলানোয় ব্যাঘাত ঘটায়, একে অন্যকে মেনে নিতে পারে না। ফলে তাদের পক্ষ-বিপক্ষের রোষে উভয় সংকটের মুখে পরতে হয় ভিক্ষুকে। একপক্ষ আলাদা মন্দির স্থাপন করে, সেখানে তাদেরকেও সগৌরবে সমর্থন করতে অন্য ভিক্ষুরাও উঠে পরে লাগে। উভয় পক্ষের সমস্যার সমাধানের দিকে না গিয়ে আয়োজন করেন নানা অনুষ্ঠানাদি, অন্যপক্ষও তারই জবাবে চালিয়ে যান নানা অনুষ্ঠান, তাও আবার একই দিনে। এভাবেই আলাদা আলাদা অনুষ্ঠান আর কীর্ত্তন চলতে থাকে দুইভাগে। কার আয়োজন কত ভালো হয়, কে কত সফলতার সাথে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলো, এমন অভ্যন্তরীণ তর্ক বিতর্কও চলে। মোটকথা, ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো দুইপক্ষের শক্তি সামর্থ্য আর হিংসা প্রদর্শনের এক অভিন্ন মাধ্যম হয়ে ওঠে।

এভাবেই ধর্মের নামে গ্রামবাসী দিনের পর দিন একে অপরের শত্রু হয়ে যায়। সামাজিকভাবেও তারা একে অপরকে বয়কট করতে শুরু করেন। এক পক্ষের কেউ অন্যপক্ষের কারো বাড়িতে বিয়ে, শ্রাদ্ধ বা যে কোন সামাজিক বা ধর্মীয় অন্যান্য আচার অনুষ্ঠান ত্যাগ করতে থাকেন। একপক্ষের লোকজন অন্যপক্ষকে তাদের এলাকার রাস্তা ব্যবহার করতে দেবেন না, অন্যপক্ষের লোকজনের দেয়া দোকান থেকে কোন পন্য কিনবেন না, এমনি করে দুই পক্ষ সম্পূর্ণরুপে একে অপরের শত্রু হয়ে ওঠেন।মাঝেমাঝে দুইপক্ষে ছোট-খাটো মারামারি হাতাহাতিও চলে, যা থানা কোর্টকাচারি অবদি গড়ায়। কয়েক দফায় মীমাংসা শালিশ হলেও, কে কার কথা শোনে!!!

ধর্ম অবশেষে আমাদের কি দিল? একজনও ভক্তি শ্রদ্ধা নিয়ে বিহারে যান না। নীতি নৈতিকতার কোন চর্চা নেই। বাড়লো হিংসা বিভেদ আর হানাহানি। ধর্ম সমাজকে ভিন্ন করলো, নতুন জেনারেশনের মাঝে একটা আকাশ সমান দেয়াল তৈরী করে দিল, আর শত্রুতার বিষে ভাই বন্ধু হয়ে গেল শত্রু। বড়ুয়াদের অনৈক্যতার সূচনা হয় মূলত এখান থেকে। একারনে বড়ুয়ারা কোনো দিন ঐক্য থাকতে পারবে না। ঐক্য না থাকার কারণে যারা জ্ঞানী গুণী নিবেদিত প্রাণ এদের সম্মান ও মান্যতা কালে কালে উপেক্ষিত হয়েছে, হচ্ছে, এবং আগামীতেও হইবে। এমনকি জাতিয় পর্যায়েও স্বঅধিকার আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে। কিছু অদূরদর্শী গতানুগতিক ভিক্ষু ও গৃহীরাই এরজন্য দায়ী। এদের হাতেই সূচনা হয় পক্ষ বিপক্ষ
সমর্থন করা। এর মধ্যেই কিছু কিছু ভিক্ষুরাও এমন একটি পক্ষ বিপক্ষের কোন্দলে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগকে ভিক্ষুজীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন মনে করেন। তাই তারাও বুদ্ধাদর্শ ভুলেগিয়ে বাবুদের অধীনে অনুষ্ঠানাদিতে যোগাদান সহ দায়কদের ফাং গ্রহন-বর্জনে একচোখা হয়ে পরেন। আজ সংঘরাজ নিকায়ের কোন ভিক্ষু যদি সমাজ ও জাতীয় কল্যানে এগিয়ে আসে মাথের নিকায়ের পক্ষের ভিক্ষুরা বলবে ভিন্ন কথা, আবার অন্য দিকে মাথের নিকায়ের কোন ভিক্ষু যদি সমাজ ও জাতির কল্যানে ব্রতী হন সংঘরাজ নিকায়ের ভিক্ষুরা বলবে ভিন্ন কথা। এছাড়া উচিহ্লাবাদী, শীলানন্দবাদী, দিপাংকরবাদী, শরনংকরবাদী ইত্যাদি ইত্যাদি, এক দল এক দলকে ভিন্ন চোখে দেখে। এদের সবাই সূচি পবিত্র পরিশুদ্ধ বলে নিজ নিজ ভক্তরা শ্লোগান তুলে। আর দায়ক ভক্তরা পূর্বাপর চিন্তা না করে অর্থবলে বিহারের পর বিহার, সংঘটনের পর সংঘটন প্রতিষ্ঠা করে।

সবার দাবী তাদের নিজ নিজ মান্যতাই শ্রেষ্ঠ। তারই সূত্র ধরে একগ্রামে পূর্বে অনেক গুলো বিহার থাকার পরও আবার নতুন বিহার হচ্ছে। কেউ যদি মনে করেন বিহার নির্মান পুন্যের কাজ বুদ্ধ প্রসংশিত। তবে তাতে আমার দ্বিমত রয়েছে। আপনি যদি এতো ধার্মিক হয়ে থাকেন তাহলে বলব- পুরোনো জীর্ণশীর্ণ পুর্বপুরুষদের স্থাপিত বিহারগুলো সংস্কার করুন আর না হয় যে গ্রামে ধর্মচর্চায় প্রতিকুল, যোগাযোগ বিছিন্ন, বিহার ভিত্তিক ধর্মচর্চা সুলভ্য নয় সেসব গ্রাম ও নগরে বিহার স্থাপন করুন তাতে আমার হাজারো সাধুবাদ। তবে দলাদলি আর নেতৃত্বের অপব্যবহারে পাশপাশি নতুন বিহার নয়। তবে হ্যাঁ, বিশ্বমানের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হলে ভিন্ন কথা। উভয় পক্ষের ভিক্ষুদের উচিত তাদের স্ব স্ব গৌরব অক্ষুণ্ণত রেখে জাতিয় ঐক্যের দূরদর্শী হয়ে কিছু স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া গৃহীনেতৃত্বের কবলে নিজেদেরকে বিলিয়ে না দেওয়া এবং বিহার কমিটির অধীনস্থ পঙ্গুত্বতা বরণ না করা। বিনয় লঙ্গিত সঙ্ঘ সদস্যেকে শাস্তি বা বর্জন করা। সাঙ্ঘিক কল্যাণমুখী কর্মে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখা। প্রতিটি বিহারের প্রভাতী ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করা। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে ব্যয় সঙ্কোচন করে অসুস্থ ভিক্ষুদের চিকিৎসা, ফাং স্থাপন করা, ইত্যাদি ইত্যাদি।

পরিশেষে আমাদের মনে রাখা উচিত- ভিক্ষুরা জাতির চালিকা শক্তি ও উত্তোরণের চাবিকাঠি। অনুরোধ থাকবে- কেউ বিষয়টিকে ব্যক্তিগতভাবে না নেওয়ার।

#লেখাটি  Subrata Barua  কর্তৃক পোস্ট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে । 

“হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে হৃদয়ে রয়েছ গোপনে”

“হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে হৃদয়ে রয়েছ গোপনে”

“হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে হৃদয়ে রয়েছ গোপনে”

সবার জীবনে প্রেম আসে নীরবে- সরবে , কারণে-অকারণে চলমান জীবন প্রবাহে । তাই কিংবদন্তী শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের গানে প্রেমের অনুভূতিটা জাগিয়ে তুলে মনে মনে বলি – প্রেম একবার এসেছিল নীরবে , আমারই এ দুয়ার প্রান্তে , সে তো হায় মৃদু পায় , এসেছিল পারিনি তো জানতে । বেশ কিছুদিন ধরে করোনা কালে সোশ্যাল মিডিয়ার এমন মন কাড়া কিছু আবেদনময়ী ছবি দেখে মনের একান্ত অনুভবে , ভালোবাসা ও প্রেম নিয়ে লেখার অনুভূতি জেগে উঠলো। ভালোবাসা পরের কল্যানে , পরহিত , স্বতন্ত্র , সার্বজনীন এবং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এক অনুভূতির নাম। ইহা মানবের কল্যানে নিবেদিত এক মহান ব্রত।ভালোবাসার কোন চাওয়া – পাওয়া বা দেনা – পাওনা নেই। মানবতার দায়িত্ববোধ থেকেই পরের কল্যানে নিজেকে সঁপে দেওয়া। আর প্রেম হলো ভালোবাসার একটা অংশ বটে কিন্তু সংকীর্ণ , স্বার্থপরতা , আত্মহিত , আত্মসুখ , আত্মতৃপ্তি ও কামনা বাসনাপূ্র্ন। ভালোবাসা হয় একপক্ষ থেকে আর প্রেম হয় উভয় পক্ষ থেকে। ভালোবাসার জন্য প্রেম আবশ্যক নয় কিন্তু প্রেমের জন্য ভালোবাসা অপরিহার্য। ভালোবাসা আর প্রেম সারাজীবন শব্দ দুটোর ব্যাপক ব্যবহার করে থাকি।কোনদিন গভীরভাবে ভেবে দেখা হয়নি শব্দ দুটোর আসলে পার্থক্য কিরূপ ! আপাতদৃষ্টিতে ভালোবাসা আর প্রেমের মধ্যে তেমন কোন পাথর্ক্য দেখা যায় না। কিন্তু ভালোবাসা আর প্রেমের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। “ভালো” হলো বিশেষণ আর “বাসা” ক্রিয়া তার অর্থ হলো উত্তম, শুভ, হিতকর, নীরোগ, সুস্থ, সৎ, নিরীহ, সুন্দর, দক্ষ বা কল্যান কামনা করা। এক কথায় ভালোবাসা শব্দটির অর্থ গভীর ও বিশাল। ভালোবাসা শাশ্বত ও চিরস্থায়ী। ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ মানব কল্যানে নিজেকে আত্মদান করা। মানব জীবনকে সমৃদ্ধ ও সামাজিক কাছে নিজেকে আত্মনিয়োগ বা সমর্পণ করা যায় একমাত্র ভালোবাসা বা পরের কল্যান সাধনে। ভালোবাসা সাধারনত এক তরফা হয়ে থাকে এবং বহুজনহিতকর ও মোহহীন। ভালোবাসাতে দুই পক্ষের কোন স্বার্থপরতা বিদ্যমান থাকে না। প্রধান ভূমিকা হলো আত্মত্যাগ তাই ভালোবাসা পরহিতকর, মঙ্গলজনক ও কল্যাণকামী। ভালোবাসাটা হচ্ছে মানুষের মনের আবেগ অনুভূতির একটা স্বাভাবিক রূপ। মানুষের প্রতি মানুষের বন্ধুত্ব , শ্রদ্ধাবোধ , মমত্ববোধ ও আত্মীয়তার বন্ধন থেকেই ভালোবাসার সৃষ্টি। ভালোবাসা একেক সময় একেক রকম রূপ , রং ও বৈশিষ্ট্যময়। মাতাপিতার সাথে সন্তানের ভালোবাসা , ভাই-বোনের ভালোবাসা , ছোটদের প্রতি বয়োজ্যেষ্ঠদের ভালোবাসা , সমাজে প্রতিটি স্তরে একে অপরের প্রতি আন্তরিকতার সহিত সুখে দুঃখে একাত্মতায় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ভালোবাসা ব্যতীত এ বিশ্বায়নের যুগে পূর্ব-পশ্চিমে ও উত্তর-দক্ষিণে সর্বত্র যে আত্মার বন্ধনে মিতালী চলছে তা কি আদৌ সম্ভব ছিল ! সত্যিকারের ভালোবাসা কোনদিন ভুলা যায় না বা দূরেও সরে যায় না। এ প্রসঙ্গে কবিগুরু রবি ঠাকুরের ভাষায় ,” নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে ,হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে হৃদয়ে রয়েছ গোপনে”।অন্যদিকে প্রেম হলো মনের প্রশান্তি বা মনের একান্ত চাওয়া। প্রেম হলো বিশেষ্য এর অর্থ বন্ধুত্ব , স্নেহ , শ্রদ্ধা , ভক্তি , প্রীতি , আসক্তি , আকর্ষণ , টান , পছন্দ , অনুরাগ , প্রণয় , সুহৃদ , প্রণয়ের পাত্র বা ভালোবাসা , স্বামী বা ভাললাগে এমন ব্যক্তি বা বিষয়। সাধারনত মনের একান্ত চাওয়া , আত্মহিত , আত্মসন্তুষ্টি থেকেই প্রেমের জন্ম বা প্রেমের উৎস। প্রেমটা অবশ্যই দু’পক্ষের হতে হয় কোনভাবেই এক পক্ষ থেকে প্রেম হয় না। প্রেমের গভীরতা বা আবেদন ভালোবাসা থেকেও অনেক বেশী। প্রেম ভালোবাসার একটা রূপ। মনের মত মন খুঁজে সত্যিকারের প্রেম করা এক ধরনের শিল্প বৈকি। প্রেম কখন কার জীবনে আসে বা হানা দেয় তা বলা মুশকিল। তাই বলা হয় , ” Love at first site” যে কোন বয়সে যে কোন সময় প্রেম মানুষের মনে দোলা দিয়ে যায়। অনেকটা মনের আনন্দ বা খোয়াকও বললে কটুক্তি হবে না। প্রেমে বয়স , সম্পর্ক , জাত , লিঙ্গ , সৌন্দর্য তেমন কিছু আসে যায় না মনের ভাললাগাটার প্রাধান্যই অন্যতম। ভালোবাসা ও আসক্তি বেড়ে যাওয়ার হলো প্রেম। দুইটি মন যখন খুব কাছাকাছি , জানাজানি ও বোঝাপড়ার ঐক্যমতে পৌঁছে তখন শারীরিক সম্পর্ক ছাড়াও তাদের মধ্যে প্রেম সৃষ্টি হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় প্রেম বিষয়টা বলার লোভ সামলাতে পাচ্ছি না। কর্মময় জীবনে দীর্ঘ পরিক্রমার প্রাণপ্রিয় এক কলিগের সাথে এমন হৃদয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি যা আমি আর ঊনার জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পূর্ব-পশ্চিম আমাদেরকে তেমন আলাদা করতে পারিনি। কোন কাম্যতাও নেই শুধু বিশ্বাস আর আস্হা বা বোঝাপড়া। অনেক স্বামী -স্ত্রী মধ্যেও এমন মিল আছে কিনা সন্দেহ ! লিঙ্গ আর বয়সটা নাই বা বললাম আপাতত। এটা হলো প্লেটোনিক প্রেম ( Platonic Love) বা শুদ্ধতম ভালোবাসা আবার আত্মিক ভালোবাসাও বলা যায়। এ প্রেম শরীরী নয় , অশরীরী। Platonic এ শব্দটির উৎপত্তি মূলত প্লেটোর “প্লেটোনিজম” মতবাদ থেকে। আবার প্লেটোর ছাত্র এরিস্টটল বলেন , যে প্রেম রাজাধিরাজের মতো দুহাত ভরে শুধু দিয়ে যায় , নেয় না কিছুই। যৌনতা ও কামগন্ধহীন শুধু হৃদয়ের বন্ধনেই এই সর্বোৎকৃষ্ট প্রেমকে লাভ করার জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর দুঃসহ যন্ত্রনাসমূহও নীরবে সহ্য করতে হয়।কোন রকম চাহিদা বিহীন অনন্ত ভালোবাসা। যা ভালোবাসার সবোর্চ্চ পর্যায়ে এক গভীর ও প্রচন্ড ভালোবাসা ।এমন প্রেমকে স্বর্গ সুখ মনে হয় তা হলো Friendly Love.প্রেমের কবি হেলাল হাফিজ তাঁর “পৃথক পাহাড়” কবিতায় বলেছেন , ” কতোটুকু দিলে বলো মনে হবে দিয়েছি তোমায়আপাতত তাই নাও যতোটুকু তোমাকে মানায়”। পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে আজ অবধি ও মানব জন্মের ইতিহাস একই সূত্রে গাঁথা। পৃথিবীর প্রায় সকল সমাজে এই প্রেমকে শাশ্বত এবং পবিত্র বলে ধরে নেওয়া হয়। পৃথিবীর অমর প্রেমগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়।পৃথিবীর প্রথম নর-নারী আদম-হাওয়া পরস্পরের প্রেমে পড়েছিলেন। এ ছাড়া শ্রী রামচন্দ্রের পবিত্রতা স্ত্রী সীতার প্রেমে পড়েছিলেন স্বয়ং রাবন। এজন্য তিনি সীতাকে অপহরণ করে অশোককাননে বন্দী রেখে দেহ-মন পাবার সমস্ত কলাকৌশল অবলম্বন করেছিলেন। বৌদ্ধশাস্ত্রে উল্লেখ আছে , কর্কশ বাক্যজনিত কারণে কর্মের বিপাকে আম্বপালি বৈশালী রাজ্যে রূপের অনন্য খ্যাতি সম্পনা সুন্দরী রমণী হয়ে জন্মেছিলেন। যাঁর চেহারা এত সুন্দর – যে কেউ শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। বৈশালী লিচ্ছবী রাজকুমারগণ তাঁকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়েছিলেন। এমতাবস্থায় , বৈশালীর রাজা এ মহাবিতর্ক নিরসনে রাজকুমারদের গণিকা করে তাঁর প্রাপ্যতা নির্ধারণ করে দিলেন। মগধের রাজা বিম্বিসারও আম্রপালির প্রেমে মুগ্ধ ছিলেন। তাঁদের গোপন প্রেমে এক পুত্র সন্তান জন্ম দেন। সেই পুত্র বুদ্ধের শাসনে প্রব্রজিত হয় , তিনি নিজের পুত্রের ধর্মসুধা শ্রবণ করে আম্রপালি ভিক্ষুণী হয়ে অচিরে অহর্ৎফল বা জ্ঞানচক্ষু লাভ করেন , দুঃখ হতে চিরমুক্তি হন এবং কর্মবিপাক উপলব্ধি করেন। যাহোক , সুন্দরের প্রেমে রাজা , মহারাজা ও রাজপুত্রগন কেউ বাদ পড়েন না কিন্তু সমাজে প্রেম ভালোবাসার স্বীকৃতি পাওয়াটা আজো কঠিন রয়ে গেল। অপূর্ব সুন্দরী হেলেনের প্রেমে পড়েছিল গ্রীক পুরাণের প্রেমিক পুরুষ প্যারিস। হেলেন তখন রাজা মেনেলাসের স্ত্রী। তাই এই ভালোবাসা তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় স্বীকৃত ছিল না। ফলে ধ্বংস হয়েছিল ট্রয় নগরী। ইতিহাসে প্রেমে মিলনের চেয়ে বিরহটাই বেশী দেখা যায়। কথায় আছে , বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না ইহা দূরেও ঠেলে দেয়। যেমন সাইকি – কিউপিড (গ্রীক) , রাধা- কৃষ্ণ (ভারত উপমহাদেশ) , লাইলী- মজনু (পারস্য) , বেহুলা- লখিন্দর (বাংলাদেশ) , রোমিও – জুলিয়েট (রোম) , ওডিয়াস – পেনেলোপ (গ্রীক) , পিরামাস- থিসবি (গ্রীক) , পিগম্যালিয়ন – গ্যালাটিয়া (গ্রীক) , দেবদাস- পার্বতী (ভারত) , ভিক্টোরিয়া- আলবার্ট (বিট্রেন) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। শত বিরহের মধ্যেও ইতিহাস কাঁপিয়ে দেওয়া প্রেম কাহিনী অনেক আছে। তদ্মধ্যে অমর প্রেমের মহাকাব্য রচনা করেছেন মোগল সম্রাট শাহাজাহান তাঁর পরমাসুন্দরী স্ত্রী আরজুমান্দ বানু বেগম মমতাজ এর জন্য উৎসর্গকৃত সমাধির স্মৃতিসৌধ প্রেমের তাজমহল। আজো স্বগৌরবে নান্দনিক স্থাপত্যকলা ও নির্মাণশৈলীর জন্য পৃথিবীতে সপ্তমাশ্চ্যর্যের স্থান দখল করে আছে। সম্রাট শাহজাহান আর মমতাজ বেগম যে সৌধের ছায়ার চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তা আজও পৃথিবীতে বিরল প্রেমের ভালোবাসার নিদর্শন। এ প্রসঙ্গে আমার খুব মনে পড়ে কবিগুরু রবি ঠাকুরের রোমান্টিক উপন্যাস “শেষের কবিতার” প্রেমিক পুরুষ ব্যারিস্টার অমিত রায় তাঁর একান্ত ভালোবাসা কে প্রকাশ করে এভাবে , “কেতকীর সঙ্গে আমার সম্বন্ধে ভালোবাসাই , সে যেন ঘড়ার তোলা জল প্রতিদিন তুলবো , প্রতিদিন ব্যবহার করবো। আর লাবণ্যর সঙ্গে আমার ভালোবাসা সে রইলো দীঘি , সে ঘরে আনবার নয় , আমার মন তাতে সাঁতার দিবে”।একান্ত অনুভবে , করোনাকালে মমতাময়ী মা যেমন করোনা ভাইরাস মরণব্যাধি জেনেও মাতৃত্বের বন্ধনে সন্তানকে বুকে নিতে কার্পণ্য করেনি। আবার জীবন জীবিকার সন্ধানে তরুণ স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের বিদায় বেলায় আলিঙ্গন থেকে দূরে থাকতে পারিনি। শ্বাসকষ্ট লাঘব করার জন্য নির্ঘুম পিতার বুকে সন্তানের ভালোবাসার জায়গাটার অভাব হয়নি তদ্রূপ প্রবীন জুটিরাও প্রেমের শেষ আলিঙ্গন করতে ভুলেননি। ভালোবাসা আর প্রেম একাকার হয়ে বিশ্বজগৎ কে মহিমান্বিত করে তোলে চিরকাল। এই ভালোবাসা ও প্রেমের কারণে রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা , গান , উপন্যাস , প্রবন্ধ , কাব্য , নাটক , চলচ্চিত্র শিল্পকর্ম তথা বিশাল সাহিত্য ও শিল্প জগত।প্রেম ছিল , আছে ও থাকবে পৃথিবীর সাথে একাত্ম হয়ে মিলেমিশে রচনা করবে হাজারো প্রেম কাহিনী।যেই দিন পৃথিবীতে ভালোবাসা ও প্রেম থাকবে না সেই দিন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে । কারণ ভালোবাসা ও প্রেম থেকেই তো পৃথিবীর সৃষ্টি সভ্যতা চলমান , তাই প্রেম অম্লান ও ঐশ্বর্যময়। সকলেই ভালোবাসা ও প্রেম নিয়ে বাঁচতে চায় জীবনের শেষ অবধি। তাই পরিশেষে বলি, ” We are most alive , When we are in LOVE “.

✍️

লিখেছেন- ঝর্না বড়ুয়া লং বীচ, ক্যালিফোর্নিয়া

প্রবীণের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও নবীনের তেজোদীপ্ত শক্তি : অনন্য পরম্পরা

প্রবীণের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও নবীনের তেজোদীপ্ত শক্তি : অনন্য পরম্পরা

প্রবীণের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও নবীনের তেজোদীপ্ত শক্তি : অনন্য পরম্পরা

ঝর্না বড়ুয়া

এক মহাপ্রাণ জীবনের হাত যখন উদীয়মান তেজস্বী দীপ্তমান যুবকের হাতে হাত রাখে তা যে কত দিক থেকে অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ হয় -তা সহজে উপলব্ধি করা যাবে না। কত বিনয়, শ্রদ্ধা, সম্মান, গভীর বিশ্বাস ও ভালবাসার জন্ম এই প্রবীণ ও নবীনের মেলবন্ধন এবং আস্থার এক বিশাল ভরসার জায়গাসহ প্রবীণের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও নবীনের তেজোদীপ্ত শক্তির এক যেন মহামিলনের মহাক্ষণ।
মানবজীবনের মানবিক গুণাবলীর মধ্যে নির্মল আচরণ অন্যতম। পরিবার থেকে এই মানবিক গুণাবলী রপ্ত বা অর্জন করে বড়দের শ্রদ্ধা-সম্মান, প্রেম-প্রীতি, ভালবাসা ও উদারতা দিয়ে সমাজকে সুন্দর ও ঐক্যবদ্ধ করা যায়। এ মহৎ গুণাবলীতে পরিবারসহ সমাজের সর্বস্তরে সুখ-শান্তি বিরাজ করে। এরূপ সুন্দর মার্জিত আচরনের মধ্য দিয়ে একদিকে নিজেকে পরিশুদ্ধ জীবনের অধিকারী করা যায় অন্যদিকে বড়দের আস্থাভাজন হওয়া যায়। বড়দের ভালবাসা সহজে অর্জন করা যায়। বিনয় মানুষকে সর্বদাই মহান থেকে মহীয়ান করে তোলে। মহামতি গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা থেকে বলা যায় : ‘অসেবনা চ বালানং পন্ডিতানঞ্চ সেবনা / পূজা চ পূজনীয়ানং এতং মঙ্গল মুত্তমং’। ( পালি)। বাংলায় বলা হয়, ‘মূর্খ লোকের সেবা না করা, জ্ঞানী লোকদের সেবা করা ও পূজনীয় ব্যক্তিগণের পূজা করা উত্তম মঙ্গল’।
সভ্যতার শুরু থেকে পরিবার বা সমাজে ছোট-বড় সকলে এক সাথে বসবাস করে আসছে। মাতাপিতা, বয়োজ্যেষ্ঠ ভাই-বোন, শিক্ষক -শিক্ষিকা ও অভিভাবকরাই সমাজে বড়জন বা গুণীজন। সমাজ সংসারে বয়োজ্যেষ্ঠরা নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। জীবন ও জগৎ সংসারে বড়দের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ও সুদূরপ্রসারী চিন্তা-চেতনা অনেক বেশী বাস্তবসম্মত সময়োপযোগী প্রাজ্ঞ, গভীর ও সঠিক চিন্তনের বহিঃপ্রকাশ হয় সমাজ বিনির্মাণের সর্বত্র। সেক্ষেত্রে বড়দের আদেশ-উপদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও বিনয়ী হয়ে জীবন চলার পথকে অনুসরণ করলে সে জীবনও হয়ে উঠে মহিমান্বিত, অনুশীলনীয় ও সমাজে দৃষ্টান্তস্বরূপ।
কবিগুরু রবি ঠাকুরের ভাষায়,
‘পাতায় পাতায় আবোল-তাবোল, শাখায় দোলাদুলি,
পান্থ হাওয়ার সঙ্গে ও চায় করতে কোলাকুলি
ওগো প্রবীন, চলো এবার সকল কাজের শেষে
নবীন হাসি মুখে নিয়ে চরম খেলার বেশে’।
বৃদ্ধদের সম্মান করা মানবজীবনের গুণাবলীর অংশ। আমরা সাধারণত বয়স ও সম্পর্কের ভিত্তিতে ছোট-বড় পার্থক্য করে থাকি। বয়সের দিক থেকে কেউ বড় কেউ ছোট। সে বিবেচনায় পরিবার সহ সমাজের বয়োবৃদ্ধরাই সবচেয়ে বড়। তাঁরাই সবচেয়ে বেশি সম্মান, ভক্তি ও শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য। আবার বড়-ছোট তারতম্য কখনো কখনো শক্তি – সামর্থ্য, জ্ঞান – বিজ্ঞান, পদ – পদবী, প্রভাব – প্রতিপত্তি, মর্যাদা ও ক্ষমতার উপরও নির্ভর করে। যেভাবে ধরা হোক না কেন, মানবের ধর্মই হলো গুণীর পুজা করা, সম্মান করা ও গৌরব করা। এতে করে যেমন গুণী সৃষ্টি হবে, প্রজন্মরা তা ধারণ করবে, গুণীজনদের জ্ঞান- অভিজ্ঞতা থেকে ধারাবাহিকভাবে ছোটরা তা গ্রহণ করে সমাজকে সুসংহত করবে। সর্বোপরি সমাজে ‘চেইন অব কমান্ড’ রক্ষা হবে এবং সবার মধ্যে মৈত্রীপূর্ণ সুসম্পর্ক সৃষ্টি হবে। সমাজে সুখ ও শান্তি বিরাজ করবে। বড়-ছোট সবার মধ্যে গভীর আন্তরিকতা ও বুকভরা আত্মতৃপ্তি নিয়ে আনন্দের সঙ্গে মিলেমিশে একাত্মা হয়ে পৃথিবীতে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারবে। আর বড়রা ছোটদের স্নেহ, মায়া, মমতার পরশ দিয়ে আদর্শ চরিত্র, নেতৃত্ব, প্রতিভাবান ও সর্বোচ্চ পেশায় প্রতিষ্ঠিত করে থাকেন। এতেই বড়দের সাথে ছোটদের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। যেখানে ছোটদের ভুল ত্রুটি গুলো বড়দের অভিজ্ঞতা দিয়ে সংশোধন করে আবার নতুন উদ্যেমে পথ চলতে সাহসী করে তোলে। এভাবেই আমরা সকলে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠি। আবার অন্যভাবে যদি বলি, ‘সম্মান করলে সম্মান বাড়ে’। তাই বিনয় শিক্ষা গৌরবের শিক্ষা। গুনীজনদের সম্মান করলে গুনীরা যেমন আনন্দিত হয় তেমনি আশীর্বাদও করেন। সেই আশীর্বাদ একদিন গুণী হওয়ার পাথেয় হয়। আমরা আসলেই মানুষের গুণকে তেমনভাবে প্রশংসা না করে দোষ গুলোকে বেশী চিহ্নিত করি। যদি মানবের গুণ গুলো বেশি করে ফুটিয়ে তুলতে পারি তাতে করে মানুষের মনে যেমন শান্তি দেওয়া যায় তেমনি গুণ গুলো অনেকের জীবনে প্রতিফলনও হয়। গুণ বিবেচনায় মানুষকে সম্মান করা উচিত। এতে করে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সমাজে শান্তি- শৃঙ্খলা, আন্তরিকতাপূর্ণ সুন্দর ও সুখী জীবন অতিবাহিত করতে পারি।
কবি মির্জা ওবায়দুর রহমান এর ভাষায় :
‘প্রবীণ হলেও বলোনা কখনও প্রবীণ
মনটা প্রতিটি ক্ষণ রেখো নবীন,
প্রবীণের মাঝে নবীন লুকায়িত
নবীন থেকেই নবধারা প্রবাহিত’।
ব্যক্তিগত অনুভবে বলতে চাই, মানবজীবনে যেসব লোক স্ব স্ব ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে মর্যাদা ও সম্মান লাভ করেছেন তারা সকলেই প্রবীণদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজ মেধাশক্তিকে বিকশিত করে নব আবিষ্কার মানব জীবনে মঙ্গল বয়ে এনেছে। কেননা মানুষ বিশ্বাস করে সর্ববিধ গুণের অধিকারী প্রবীণরাই নবীনদের জীবনকে সর্বক্ষেত্রে বাসযোগ্য করে তুলেছেন তাঁহাদের আপন মহিমায়। কারণ প্রবীণরা হলো জ্ঞানবৃক্ষ। যদি বংশানুক্রমিক জন্মগত বৈশিষ্ট্য মানুষের মনোযোগ ও প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হয় তাহলে উত্তম আচার – আচরণ ও সকল ভদ্র আচরণকারী মানুষের সম্মান ও শ্রদ্ধা অর্জন করবে। প্রথমোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ হচ্ছে জন্মগত আর শেষোক্ত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উপার্জিত কর্মফল ও চিন্তা-শক্তি প্রসূত। আমাদের এই বিচার শক্তির মাধ্যমে সমগ্র জীবনব্যাপী সুকর্ম পরিচালনা করতে পারি।
যাঁরা জীবনে শ্রেষ্ঠতা ও উন্নতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন তাঁরা সমাজে উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা বা নক্ষত্র হিসাবে মানবতার পথকে সুগম করেছেন। তাঁরা মানুষের নৈতিকতা ও ধর্মের পথে সঠিক পথ নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এভাবে মানবজীবনে প্রবীণ ও নবীনের মধ্যে দূরত্ব দূর করে বংশপরম্পরার গুরু-শিষ্যের মত শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দিয়ে এ জগৎ সংসারকে জয় করেছেন গুণীজনরা। আগামী প্রজন্মকে সত্য, সুন্দর ও সঠিকভাবে দিক- নির্দেশনা দিয়ে উন্নতি ও অগ্রগতির পথে অগ্রসর করতে প্রবীণ ও নবীনের মেলবন্ধনই যথেষ্ট। সকলের চেষ্টা হউক,
” When you do your best, you become better of what you do”.
জগতে সকলের মঙ্গল হউক।
লেখক : প্রাবন্ধিক

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় কে জ্বালিয়েছিলেন এবং কেন?  । ত্রিরত্ন ডট কম

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় কে জ্বালিয়েছিলেন এবং কেন? । ত্রিরত্ন ডট কম

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় কে জ্বালিয়েছিলেন এবং কেন?

লিখেছেন- ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

আমরা জানি যে, যে কোন দেশের উন্নতি ও বিকাশ সে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলির উপর নির্ভর করে। দেশের শিক্ষার্থীরাই পরবর্তীতে এসে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়, দেশের জন্য নিয়ম কানুন বানিয়ে থাকে। এরকমভাবে আমরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে সত্তরটিরও অধিক বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রমান পেয়েছি। এগুলির মধ্যে নালন্দা, তক্ষশীলা, বিক্রমশীলা, সোমপুর, পণ্ডিত বিহার, জগদ্দল, ওদন্তপুরী ইত্যাদি ছিল সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য।

আমরা ইতিহাসে পড়েছি যে, দ্বাদশ শতাব্দীতে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন্ বখতিয়ার খিলজী নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। এখনও পর্যন্ত আমরা ইহাই জানি এবং এরূপই প্রচার করা হয়েছে। কেন জ্বালিয়েছিলেন সে সম্পর্কে কোন উত্তর পাওয়া যায়না। ইহাতে ঐতিহাসিকগণ মৌনতা ধারণ করে থাকেন।

এখন প্রশ্ন উঠে আসে যে, বখতিয়ার খিলজী ছিলেন তুর্কী। তিনি আফগানিস্তান হয়ে খাইবার গিরি পার করে পান্জাব-গুজরাত- দিল্লী পর্যন্ত পৌঁছে আবার সেখান হতে উত্তর প্রদেশ হয়ে বিহারের নালন্দায় পৌছলেন এবং সে সময় নালন্দা ছিল ব্রাহ্মণ আনুগত্য সেন বংশের রাজাদের অধীনে। একজন তুর্কী এতদূর দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে সেন বংশের রাজ্য নালন্দায় আসেন এবং নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্বালিয়ে ভস্ম করে আবার চলেও গিয়েছেন, একথা ভাবতেই কেমন লাগে! কি করে তা সম্ভব হল? এ অসম্ভব কার্য তিনি কিভাবে করতে পেরেছিলেন তা তো ভাববার বিষয়।

যখন কোন লুঠেরা ভারতবর্ষে আসত, তারা মন্দির সমূহকে এজন্য লুঠ করত, কেননা সেখানে স্বর্ণের ভাণ্ডার মওজুদ থাকত এবং সেগুলি তারা লুঠ করে নিয়ে যেত। আমাদের কাছে সে রকম কোন প্রমাণ নাই যে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে সোনা মওজুদ ছিল, যা তারা লুঠ করে নিয়ে যাবে। কেবল এতটুকু বলা হয় যে, বখতিয়ার খিলজী জ্বালিয়ে দিয়েছেন। তবে কেন জ্বালিয়ে দিয়েছেন, সে সম্পর্কে আজ আমরা আলোচ্য নিবন্ধে আলোচনা করব। এখানে রয়েছে গভীর ষড়যন্ত্র এবং সে ষড়যন্ত্র কি ছিল, তা আমরা আজ জানতে পারব।

মহাযান বৌদ্ধরা অবলোকিতেশ্বর ত্রিলোকনাথ বোধিসত্বের পূজা করে থাকেন। অবলোকিতেশ্বরের মুর্তির মাথার উপরে স্থাপিত থাকে বুদ্ধের ছোট মুর্তি। হিমাচল প্রদেশের লাহোল স্পিতি জিলা হতে ৩৭ কিলোমিটার দূরে ত্রিলোকীনাথ নামে এক গ্রাম রয়েছে। সে গ্রামের পূর্ব নাম ছিল তুন্দা। সেখানে অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্বের মুর্তি এখনও বিরাজমান রয়েছে। দশম শতাব্দীতে সেখানকার ‘দিবন্জ রাণা’ নামে এক স্থানীয় শাসক এ মন্দিরের স্থাপনা করেছিলেন। সে মন্দিরে অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্বের যে মুর্তি রয়েছে, তাঁর মস্তক হতে যদি বুদ্ধের মুর্তি হটিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা কোন হিন্দু দেব-দেবীর মুর্তি বলে মনে হবে। এখন আরেকটি মুর্তির কথা বলব। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি দণ্ডায়মান কালো পাথরের বোধিসত্বের মুর্তি পাওয়া গিয়েছিল। যা এখন নালন্দা সংগ্রহালয়ে বা যাদুঘরে রক্ষিত আছে। সে মুর্তিতে রয়েছে চার হাত। যে কেউ দেখে মনে করবে ইহা কোন হিন্দু দেবী-দেবতার মুর্তি হবে। কিন্তু মুর্তির নীচে লিখা আছে তা অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্বের মুর্তি। আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, বোধিসত্বের চার হাত কি করে হতে পারে?

আপনাদের আরো প্রমাণ দেখাব, মহাযানীদের অনেক বিহার রয়েছে, সেখানে বুদ্ধের আসনে বড় বড় তিনটি মুর্তি দেখা যায়। মাঝখানে থাকে তথাগত শাক্যমুণি বুদ্ধের মুর্তি, ডান দিকে থাকে গুরু পদ্ম সম্ভবের মুর্তি এবং বাম দিকে থাকে অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্বের মুর্তি। বাম দিকের অবলোকিতেশ্বর মুর্তির দিকে যখন আপনারা থাকাবেন, তাহলে দেখবেন, সে মুর্তির মস্তকোপরি থাকে আরো তিন তিনটি মুর্তি। সেগুলো সবই হল বুদ্ধের মুর্তি । সে অবলোকিতেশ্বর মুর্তির মধ্যে থাকে অনেকগুলো হাত। এরকম বহু হাত বিশিষ্ট মুর্তি হিন্দুদের মধ্যেও দেখা যায়। এ মু্র্তি সমূহ হল দশম শতাব্দীর। সেসময় কালের কি ব্রহ্মার, কি বিষ্ণুর , কি মহেশের বা ব্রাহ্মণ্যধর্মের অন্য কোন দেবী-দেবতার একটি মুর্তিও এখনও পাওয়া যায়নি।

আপনারা হয়তো ভাবছেন যে, আমি এখানে মুর্তির কথা কেন বলছি? এখন আরও একটি মুর্তি আপনারা দেখুন। তাহচ্ছে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশের পাশে কাল পাথরে নির্মিত বুদ্ধের মুর্তি। কিন্তু মুর্তির পাশে পাথরে খোদাই করে লিখে দিয়েছে শ্রী ভৈঁরো বাবা তেলিয়া ভাণ্ডার, বরগাঁও, নালন্দা। ইহা হল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাস সন্নিকটেই অবস্থিত। এবার আমরা সোজা বের হয়ে দেখব যে, এসব বলে লোকদের কারা বিভ্রান্ত করছে? তাঁরা অন্য কেহ নয়। যাঁরা শতাব্দীর পর শতাব্দী হতে নিজেদের পেট পালন-পোষণের জন্য ষড়যন্ত্র করে কুণ্ডল পাকিয়ে বসে থাকা ব্রাহ্মণেরা।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ ঊনবিংশ শতাব্দীতে বৃটিশ পুরাতত্ববিদ স্যার আলেক্সজান্ডার কানিংহাম প্রথমবারের মত অনুসন্ধান করে বের করেন। ইতিপূর্বে ব্রাহ্মণেরা বলে থাকত যে, এ স্থান আমাদের ধর্মগ্রন্থানুসারে হল গুরু খন্দহার। তাঁদের গুরুদের স্থান বলে পরিচয় দিত। যাঁরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করে আসতেন বলে সমাজে জাহির করতেন, তাঁদের ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত পরিচয়ই ছিলনা এ স্থান কিসের।কেন এ স্থান প্রসিদ্ধ তা তাঁদের কোন ধারণাই ছিলনা। যখন এক ইংরেজ ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইহা আবিস্কার করে বের করলেন, তখন সেখানে বুদ্ধের মুর্তিকে সাজিয়ে সে স্থানকে ভৈঁরো বাবার স্থান বলে পরিচয় দিচ্ছে। এখন আপনারা ভাবতে পারেন যে, ইহা কি ষড়যন্ত্র নয়? ইহাকে ষড়যন্ত্র না বলে আর কি বলা যায়। আমরা কি করে ইতিহাসকে জানব এবং কিভাবে নিজেদের ইতিহাসের পরিচয় পাব? এ প্রসঙ্গে বাবা সাহেব ড. ভীমরাও আম্বেদকর বলেছেন-‘ যারা নিজেদের ইতিহাস জানেনা, তারা কখনও ইতিহাস রচনা করতে পারেনা।’ তবে ইতিহাসের পরিচয় কিভাবে জানা যাবে? যারা ইতিহাস বলার জন্য বসে আছে, তারা তো অন্য কিছু বলে থাকে। তাতে কি করে আমাদের নিকট সত্য উদ্ভাসিত হবে? সত্যিকার ইতিহাস জানতে গেলে আমাদেরকে তিন স্তরে বিভক্ত করে দেখতে হবে।

প্রথম ভাগে হল মান্যতাবাদী লোকের অভিমত বা বক্তব্য। এরা হলেন সে ধার্মিক সম্প্রদায় যারা বিভিন্ন প্রকার মিথ্যা কথা ও কাহিনী বানিয়ে ধার্মিক ঠিকাদারটার দোকান চালিয়ে থাকে। এবং নিজেদের মনগডা কাহিনী সমূহকে ইতিহাস বলে প্রচার করতে ভ্রম তৈরী করে।

দ্বিতীয় স্তর হল পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস। যেগুলি সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত,প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়। সেগুলির ইতিহাস তো রাজনীতির শিকার। যে সরকার আসবে সে সরকার নিজেদের সুবিধামত মনগডা ইতিহাস রচনা করে থাকে। তাতে ভরসা কোথায়।

তৃতীয় পর্যায়ে আসে পুরাতত্ব ইতিহাস। পুরাতাত্বিক যে ইতিহাস রচিত হয়, তা হল খোদাই কার্যে যে বস্তু যেভাবে প্রাপ্ত হয়, তাতে যে প্রমাণ পাওয়া যায় বা সে সময়কালের যে নোটস উপলব্দ হয়, সে সব মিলিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যে ইতিহাস তৈরী হয়, তাই পূর্বের দু’রকমের ইতিহাসের তুলনায় সবচেয়ে প্রমাণিত ও গ্রহণযোগ্য ইতিহাস হয়ে থাকে। এখন আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আপনি প্রমাণিত ইতিহাস পড়বেন, না কপট গুরুদের দ্বারা কপোল ও ছলনা মূলক কাহিনীর ইতিহাসকে সত্যি মনে করে বাস্তবিক ইতিহাস হতে দূরে থাকবেন।

এরকম পুরাতাত্বিক ইতিহাসকারদের মধ্যে এক স্বনামধন্য ইতিহাসকার হলেন রাজীব পটেল। তাঁর এক বহুল চর্চিত ইতিহাস পুস্তক আমাদের সামনে এসেছে। পুস্তকটি তিনি লিখেছেন হিন্দিতে। নাম হল ‘ বৈদিক যুগ কা ঘাসমেল’। এ পুস্তকটি খুবই একটি গুরুত্বপূর্ণ বই সত্যিকার ইতিহাসকে জানার জন্য। ইতিহাস প্রেমীদের এ পুস্তকটি পড়া উচিত। এ পুস্তকের আলোকে আমি আজ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় জ্বালানোর বাস্তবিক কারণ কি ছিল তা বর্ণনা করব।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান বিহার রাজ্যের রাজধানী পাটনা হতে ৮৮.৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং প্রাচীন মগধের রাজধানী রাজগীর হতে ১১.৫ কিলোমিটার উত্তরে এক গ্রামে এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থিত রয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে আলেক্সজান্ডার কানিংহাম এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবিস্কার করেন। এখানে দশ হাজার ছাত্রদের পড়ানোর জন্য দু’ হাজার বিদ্বান শিক্ষক বা আচার্য ছিলেন। এখানে অনেক বিদেশী ছাত্র পড়ার জন্য আসতেন। যাঁদের মধ্য হিউয়েন সাং এবং ইৎ সিং চীন হতে এসে কয়েক বছর পর্যন্ত পড়া লেখা করেছিলেন। তাঁরা নিজেদের যাত্রা বিবরণীতে অনেক কিছু নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে লিখেছিলেন। হিউয়েন সাং লিখেছেন যে, দেশ-বিদেশ হতে সহস্র সহস্র বিদ্যার্থী নালন্দায় এসে জ্ঞানার্জন করতেন বলে এ বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে বেশী খ্যাতি লাভ করেছিল। ছাত্রদের পুরা দিন অতিবাহিত হত অধ্যয়নে। বিদেশী বিদ্যার্থীরাও নিজেদের মনে উদিত শঙ্কা সমূহের সমাধান করতেন বিদ্বান আচার্যদের জ্ঞানের ঝলকের সাহায্যে।

ইৎ সিং লিখেছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যদের নাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য দ্বারে খোদাই অক্ষরে লিখা হত। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের বিভিন্ন অন্চল হতে তো বিদ্যার্থীগণ আসতেনই, ইহা ছাড়া আসতেন কোরিয়া, জাপান, চীন, তিব্বত,ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মঙ্গোলিয়া প্রভৃতি দেশ হতে শিক্ষার্থীগণ বিদ্যা ও জ্ঞান আহরণ করতে আসতেন। নালন্দা হতে বিশিষ্ট শিক্ষা প্রাপ্ত ছাত্র বাহিরে গিয়ে বৌদ্ধধর্মের প্রচার বড়ই সুনামের সাথে সম্পাদন করতেন। এখানকার ছাত্রদের মাধ্যমে বৌদ্ধধর্মের জ্ঞান ভাণ্ডার ও ভারত সংস্কৃতি সমগ্র বিশ্বে প্রসারিত হয়েছিল। অন্যসব ধর্ম দর্শন কেবল ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে থেকেছিল। বৌদ্ধধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম দর্শন বা মতবাদ এত ব্যাপক গবেষণা ও অধ্যয়নের জন্য সর্বসাধারণকে উৎসাহিত করেনি। বৌদ্ধদেরই একমাত্র এরকম দেখা গিয়েছে, যারা এত বেশী বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিষ্ঠা করে জ্ঞান জ্যোতি বিলিয়েছে সমগ্র বিশ্বে। ইহার মুখ্য কারণ ইহাই ছিল যে, বৌদ্ধধর্ম স্ববিবেককে ব্যবহার করার সুযোগ দিয়ে থাকে।পুস্তক বা পরম্পরা বা গুরুদের ক্রীতদাস হওয়ার শিক্ষা দেয়না। এ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বিশ্বের প্রথম উন্নত আবাসীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সুনিয়ন্ত্রিতরূপে এবং বিস্তৃত পরিসরে নির্মিত এ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল স্থাপত্য কলারও অদ্ভূত নমুনা। এ বিশাল পরিসরের বিশ্ববিদ্যালয় চারিদিকে দেওয়াল দ্বারা ঘেরা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের জন্য এক মুখ্যদ্বার ছিল। উত্তর ও পশ্চিম মুখী হয়ে নির্মিত হয়েছিল মন্দির বা স্তূপ সমূহের কাতার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে অনেক ভব্য বিহার ও স্তূপ ছিল। সমস্ত স্তূপে বিভিন্ন মুদ্রায় ভগবান বুদ্ধের মুর্তি সমূহ তৈরী করে বসানো ছিল। এখানে বুদ্ধের জন্য ‘ভগবান’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। নালন্দায় বুদ্ধের জন্য যে ভগবান শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তা বৈদিকদের ব্যবহৃত ঈশ্বর অর্থে নয়। পালিতে ভগবান শব্দের অর্থ হল যিনি নিজের অভ্যন্তরস্থ বিকার সমূহ অর্থাৎ লোভ, দ্বেষ ও মোহাদি ভগ্ন বা ধ্বংস করেছেন, তিনিই ভগবান। অর্থাৎ একজন মানুষের আধ্যাত্মিক উচ্চতর অবস্থা প্রাপ্তিকে ভগবান বলা হয়।

এ নালন্দা বিশ্ববিদ্যলয়ে কেন্দ্রস্থিত সাতটি বড় বড় হল ছিল এবং অন্য তিন শত কামরা ছিল। সে সভাগার বা হল সমূহে ধর্ম ও দর্শনের ব্যাখা করা হত এবং কামরায় বিশ্রামের জন্য পাথরের বিছানা পাতা থাকত। প্রত্যেক কামরায় দীপক ও পুস্তক রাখার জন্য আলমারির মত থাক বনানো হয়েছিল এবং প্রত্যেক মঠের অঙ্গনে এক বিশাল বিহার বানানো ছিল। প্রত্যেক বিহারে ভগবান বুদ্ধের বড় মুর্তি, অনেক প্রার্থনা কক্ষ তথা অধ্যয়ন কক্ষ ছাড়াও সে সমস্ত বিহারে সুন্দর ফুলের বাগান এবং ঝিলও বানানো ছিল।

এত বিশাল জ্ঞানের ভাণ্ডার বিশ্ববিদ্যালয়কে বক্তিয়ার খিলজী কেন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন, ইহা এক বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে এখনও সবার মনে। এর উত্তর প্রদানে অধিকতর ইতিহাসকারগণ এখনও অনন্ত মৌনব্রত ধারণ করে আছেন। এরকম নয় যে, ইতিহাসকারগণ ইহার সত্য ইতিহাস জানেননা। তাঁরা অবশ্যই জানেন। কিন্তু মৌনব্রত ধারণ করার উদ্দেশ্য হল, তাঁরা যদি সত্যতা প্রকাশ করেন, তাহলে তাঁদের পূর্বজদের সব ষড়যন্ত্রের পর্দা ফাঁস হয়ে যাবে।

বৈদিক ইতিহাসের ঘালমেল পুস্তকে গ্রন্থকার লিখেছেন, বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ শান্তিপ্রিয় হয়ে থাকেন। এরকম অবস্থায় তাঁদের বিদ্যালয় ও তাঁদের পুস্তক সমূহ জ্বালাতে বক্তিয়ার খিলজীর তো কোন লাভ ছিলনা। তারপরেও তিনি কেন জ্বালিয়েছেন। এর পেছনে কারণ বা সত্যিকার রহস্য কি ছিল?

সে কারণ জানার জন্য সে সময় কালের রাজাদের যে রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল, সে সম্পর্কেও লেখক পুস্তকে বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, বর্তমানের বিহার এবং বঙ্গে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্য পর্যন্ত পাল বংশের অন্তিম শাসক গোবিন্দ পালের শাসন ছিল। তিনি ছিলেন বৌদ্ধ রাজা। তাঁকে পরাজিত করেই সেন বংশ বাংলা ও বিহারের শাসনভার নিজেদের কর্তৃত্বে নিয়ে নেন। এ সেন বংশের শাসকগণ ব্রাহ্মণ্য মান্যতানুসারে বেশী করে ব্রাহ্মণ্য মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন এবং যে সমস্ত বৌদ্ধ বিহার ছিল, সে গুলোকে রাজ শক্তি দ্বারা ব্রাহ্মণীকরণ করা হয়েছিল। সে সময়ের নালন্দা অন্চলের শাসক লক্ষ্মণ সেন ছিলেন কঠোর ব্রাহ্মণ্যবাদী, যে ব্রাহ্মণেরা বৌদ্ধধর্মকে মাটিতে কবর দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন পূর্ব হতেই। সে সময় বক্তিয়ার খিলজী যখন নালন্দা আক্রমণ করে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন, রাজা লক্ষ্মণ সেন তখন বিরোধ করেননি কেন? যেখানে মহাবিহার নালন্দা ও ইহার তিন তলা বিশিষ্ট তিনটি ভবনের গ্রন্থসমূহ ছয় মাস পর্যন্ত আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলেছিল। ভিক্ষুদের মেরে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। স্থানীয় জমিদার ও রাজা দ্বারা কেন আগুন নেভানোর চেষ্টা করেনি? এরকম কোন প্রমাণও পাওয়া যায় না যে, সেখানে যে সকল আচার্য-প্রাচার্যেরা ছিলেন, তাঁদেরকে বাঁচানোর জন্য কেউ এগিয়ে এসেছেন। এখনও প্রশ্ন আসে যে, এ বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হলে তো লাভ হবে ব্রাহ্মণদের। কিন্তু যাঁর কোন এখানে লাভ নেই, সে বক্তিয়ার খিলজী কেন জ্বালাতে আসলেন? ইহা তো বড় প্রশ্ন ও বড় রহস্য । কেন তিনি এ নিষ্ঠুর ও বর্বর কার্য করতে আসলেন?

সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক রাজীব পাটেল তাঁর পুস্তকে লিখেছেন যে, ১২১০ খৃষ্টাব্দের আশে-পাশে ১১৯৯ হতে ১২০৩ খৃষ্টাব্দের মধ্যে বখতিয়ার খিলজী নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ইহার কাছাকাছি সময়ের ‘তবাখত-এ-নাসিরী’ পুস্তকের লেখক মিনহাজ উস সিরাজ স্বীয় পুস্তকে লিখেছেন যে, বক্তিয়ার খিলজীর এক সময় ভয়ানক এক প্রাণঘাতী রোগ হয়েছিল। তাঁকে আরোগ্য করার জন্য চিকিৎসা করেছিলেন এক ব্রাহ্মণ বৈদ্য বা কবিরাজ। তিনি বলেছিলেন, আমি তোমাকে আরোগ্য করব, তবে এক শর্তে। শর্ত ছিল যে, তোমাকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্বালিয়ে দিতে হবে। বখতিয়ার খিলজী শর্ত মেনে নিলে ব্রাহ্মণ চিকিৎসা দিয়ে ঠিক করলেন। আরোগ্য লাভ করে বখতিয়ার খিলজী নালন্দা মহাবিহার বা বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্বালিয়ে দিয়েছে। এখানে তো আমাদের কিছু বলার নাই। কেননা এ তবাখত এ নাসিরী সে সময়কালের লিখা। অর্থাৎ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় জ্বালানোর সমকালীন পুস্তক। তিনি পুস্তকে আরো স্পষ্ট করে লিখেছেন যে, সে ব্রাহ্মণ তাঁর মনের মধ্যে পোষণ করে রেখেছিলেন, যে বখতিয়ার খিলজীর দ্বারা জ্বালানোর কাজটা করাবেন।

সেনবংশের রাজাগণ তো মনে করতেন, যখন তাঁরা বৌদ্ধ রাজাকে পরাস্ত করে দিয়েছেন তখন তাঁদের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় কেন থাকবে? ইতিহাস সাক্ষী আছে যে, যখনই ধার্মিকগণের দ্বারা শাসন কব্জা করা হয়, তখন তাঁরা সবচেয়ে প্রথমে বুদ্ধিজীবি বর্গকে শেষ করতে চায়। এবং বুদ্ধিজীবিবর্গদের শেষ করতে সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হল, যে সমস্ত ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সে গুলিকে নষ্ট করে দেওয়া। এ কাজটাই সে সময়ে হয়েছিল।

এভাবে আমরা দেখছি যে, এক বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় নিজের দেশেই কিছু কট্টর গাদ্দারদের কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। যখন এস্থানের খনন কার্য ঊনিশ শ’ শতাব্দীতে হয়েছিল, তখন অনেক প্রকারের বুদ্ধের মুর্তি সমূহ পাওয়া গিয়েছিল। সমগ্র পরিসর ছিল বুদ্ধের মুর্তিতে ভর্তি। সে মুর্তিই সে বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে সেন বংশের উত্তরাধিকারীগণ মন্দির বানিয়ে তেলিয়া বাবা ও ভৈঁরো বাবা বলে কব্জা করে বসে আছে এখন।

এ প্রকারে বেদ না মানার কারণে বুদ্ধকে নাস্তিক বানানো হয়েছে, শত্রু বানানো হয়েছে, আবার জ্ঞানী বুদ্ধ বলে অবতার বানানো হয়েছে। আবার তাঁর মুর্তিকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ বানিয়ে দিয়েছে। এবং আবার তাঁর নামে নানা প্রকার অর্ঘ্য ছডানো হচ্ছে। এখন ভাবুন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কালে তিনি বুদ্ধ ছিলেন। এবং বর্তমান সময়ে বিভিন্ন প্রকার দেবী-দেবতায় পরিণত হয়েছেন ব্রাহ্মণদের দ্বারা। এ হল ধর্মের নামে মিথ্যাচার, ষড়যন্ত্র, ছল-কপট ও ভাঁওতাবাজী তথা ধান্ধাবাজী। যাঁরা পূর্বে বুদ্ধের বিরোধ করেছিল, এখন তাঁরাই বুদ্ধকে সিন্ধুর, টিকা ও কাপড় পরিবর্তন করে রং মাখিয়ে নানা প্রকার কাল্পনিক দেব-দেবীর নাম দিয়ে পূজা করে পেট পালানোর ধান্ধা করতে রয়েছে। এগুলিই হল ভারতের সত্যিকার ইতিহাস। এখন আপনারা বুঝতে পারছেন যে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় জ্বালানোর পেছনে কত বড় ষড়যন্ত্র রচনা ব্রাহ্মণেরা করেছে। এ সমস্ত সত্যকে দাবানোর জন্য কত কত মিথ্যা পুস্তক ষড়যন্ত্রকারীরা লিখেছে। এ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো কোন দেব-দেবীর মুর্তি পাওয়া যায়নি। কেননা সমস্ত দেব-দেবীর উদ্ভব তো বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের পরেই হয়েছে। ‘বৈদিক যুগ কা ঘালমেল’নামক পুস্তকে লেখক আরো বলেছেন, বৈদিক যুগ হল সবই মিথ্যা এবং অষ্টম শতাব্দীর পরেই সব বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনকে ভাঙ্গচুর করে হিন্দু শাক্ত, শৈব যত মত ও পন্থ গঠিত হয়েছে। লেখক সেখানে আরো স্পষ্ট করেছেন পালি ও প্রাকৃত ভাষাকেই সংস্কার করে সংস্কৃত নাম দিয়ে ভাষা তৈরী করেছে। সে জন্য পুস্তকটি সবার পড়া উচিত। পুরাতাত্বিক সম্বলিত সঠিক ইতিহাসকে না জানলে এ সমস্ত ধর্মীয় ষড়যন্ত্রকারীদের ইতিহাসই মানুষকে সর্বদা ভ্রমিত করবে।

উপাসকের পেশা কেমন হওয়া উচিত ? – ত্রিরত্ন ডট কম

উপাসকের পেশা কেমন হওয়া উচিত ? – ত্রিরত্ন ডট কম

উপাসকের পেশা কেমন হওয়া উচিত ?

লিখেছেন- জ্ঞানশান্ত ভিক্ষু।

ত্রিরত্নের উপাসক বা উপাসিকা হলে তার মিথ্যাবাণিজ্য ত্যাগ করা উচিত। বুদ্ধ বলেছেন, ভিক্ষুগণ, উপাসকের পাঁচ প্রকার বাণিজ্য করা উচিত নয়। অস্ত্রবাণিজ্য, প্রাণিবাণিজ্য, মাংসবাণিজ্য, মদবাণিজ্য, বিষবাণিজ্য (অঙ্গুত্তর নিকায়.৫.১৭৭)। এখানে অস্ত্রবাণিজ্য মানে হচ্ছে অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করা। প্রাণিবাণিজ্য মানে হচ্ছে মানুষ বিক্রি করা। মাংসবাণিজ্য মানে হচ্ছে শুয়োর, হরিণ ইত্যাদি বিভিন্ন গৃহপালিত প্রাণি পালন করে বিক্রি করা। সেগুলোকে জবাই করে মাংস বিক্রি করাটাও এই মাংসবাণিজ্যের অন্তর্গত। বর্তমানে শুয়োরের খামার, মুরগির খামার, মাছের খামার এগুলোও মাংসবাণিজ্য। মদবাণিজ্য মানে হচ্ছে যেকোনো ধরনের মদ বিক্রি করা। বিষবাণিজ্য মানে হচ্ছে বিষ বিক্রি করা। এগুলো নিজেও করা উচিত নয়, অন্যদেরকে দিয়ে করানোও উচিত নয়।

অঙ্গুত্তর নিকায়ের টীকামতে, অস্ত্রবাণিজ্য করলে আপনি সেই অস্ত্র দিয়ে অপরের অপরাধের সুযোগ করে দিচ্ছেন। তাই সেটা অকরণীয়। প্রাণিবাণিজ্য বা মানুষ বিক্রি করলে সেটার মাধ্যমে আপনি অপরকে দাস বা চাকর বানানোর পথ দেখাচ্ছেন। তাই সেটা অকরণীয়।
মাংস ও বিষ বাণিজ্য প্রাণিহত্যার কারণ হয়। তাই সেটা অকরণীয়। মদবাণিজ্য করলে সেটা অন্যদের প্রমত্ততা বা মাতলামির কারণ হয়। তাই এধরনের বাণিজ্য বাদ দিয়ে ধর্মত ও ন্যায়সঙ্গত পেশার দ্বারা জীবন যাপন করা উচিত। পাঁচ প্রকারের মিথ্যাবাণিজ্যের মাধ্যমে হয়তো টাকা-পয়সা বা মানসম্মান আসতে পারে। কিন্তু নিজের ভবিষ্যতের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে বুদ্ধের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা কোনো উপাসকের উচিত নয়।

বিশুদ্ধিমার্গ মহাটীকামতে, গৃহীরা যেসমস্ত পেশার মাধ্যমে জীবন ধারণ করে সেগুলোর মধ্যে কাঠমিস্ত্রি ইত্যাদি পেশা হচ্ছে নিম্নশ্রেণির পেশা। কৃষিকাজ, ব্যবসাবাণিজ্য ইত্যাদি হচ্ছে উৎকৃষ্ট পেশা। আবার বিভিন্ন শিল্পবিদ্যার ক্ষেত্রেও বেতের কারিগর ইত্যাদি হচ্ছে নিম্নশ্রেণির পেশা। অন্যদিকে মুদ্রা গণনা বা হিসাববিজ্ঞান ইত্যাদি হচ্ছে উৎকৃষ্ট (ৰিসু.মহাটীকা.২.৪২৭)। তবে হীন হোক বা উৎকৃষ্ট হোক, নিজের দক্ষতা ও আগ্রহ অনুসারে এধরনের যেকোনো পেশায় নিয়োজিত থেকে জীবন ধারণ করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ ঘটিকার ব্রাহ্মণ অনাগামী মার্গফল লাভী হয়েও কুমোরের কাজ করে মাটির হাঁড়ি পাতিল বানিয়ে তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে ভরণপোষণ করত।

বৌদ্ধ ধর্ম দাহক্রিয়া সম্পর্কে কি বলে ? – ত্রিরত্ন ডট কম

বৌদ্ধ ধর্ম দাহক্রিয়া সম্পর্কে কি বলে ? – ত্রিরত্ন ডট কম

বৌদ্ধ ধর্ম দাহক্রিয়া সম্পর্কে কি বলে?
—অাশিন ধর্মপাল

বুদ্ধের সময়কালে দাহক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তথাগতের জীবনী বইটি পড়তে পারেন৷ বা বিভিন্ন কাহিনী পড়লেও পেতে পারেন৷

এর অনেক অাগে অামার টাইম লাইনে একটা পোষ্ট করেছিলাম৷ সেখানে প্রশ্ন করা হয়েছিল “পরিক্ষার দিনে যদি জানতে পার যে তোমার মা কিংবা বাবা কালগত হয়েছে তাহলে তুমি পরীক্ষা দিতে যাবে নাকি তাদের অন্তেষ্ঠি ক্রিয়ায় যাবে?” উত্তরটা ছিল এই রকম, ” মা বাবার প্রতি সন্তানের যে দায়ভার রয়েছে সেগুলি প্রত্যেক সন্তানের তার মাতাপিতার মৃত্যুর পূর্বেই পূরণ করা বাঞ্ছনীয়৷ অার যদি মাতা পিতার প্রতি পূর্ব হতেই করণীয় কর্মগুলি সম্পাদন করা হয়ে থাকে তাহলে মৃত্যুর পর সন্তানের ঐ মুহূর্তে উপস্থিত থাকা বা না থাকা দুটোই সমান৷ তাই অবশ্যই পরীক্ষা দিতে যাওয়া উচিত৷ ফিরে এসেও পূণ্য কর্ম সম্পাদন করতে পারে”

অভিধর্মের দৃষ্টিতে দাহক্রিয়া কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?
————————————————————————————————
এর অাগে জানা উচিত সত্বর গতি কিসের উপর নির্ভর করে৷

জানি, উত্তরটি সকলেই জানেন৷ তারপরও সামান্য বলছি৷ মরণাসন্নে সত্বার জবনচিত্ত সমূহের উপরই নির্ভর করে তার গতি৷ অার যেই মুহূর্তে তার চ্যুতি ঘটে কষ্মিন কালের ব্যবধানেই অর্থাৎ এক অন্তরকালেরও কম সময়ে অপর এক যোনিতে প্রতিসন্ধি গ্রহন করে ফেলে(এখানে জানা উচিত, প্রতিসন্ধি মানে ভূমিষ্ঠ হওয়া নয়৷ কেবল অালম্বন হওয়া৷ পালিতে যাকে ‘উপপজ্জন্তি’ বলা হয়) অার এইদিকে এই চ্যুতি চিত্ত ও ঐদিকে প্রতিসন্ধি চিত্ত এই দুই চিত্তের অন্তরকাল এতই সূক্ষ্ম যে তথাগতের পঞ্চচক্ষুতেও ঐ অন্তরকালকে নির্ধারন করা কঠিন৷ অর্থাৎ, চ্যুতি চিত্ত হওয়ার সাথে সাথেই পূর্ব জবন চিত্তের কর্মের শক্তিতে সত্বা অপর এক যোনিতে প্রতিসন্ধি গ্রহন করে ফেলে৷ যেটাকে প্রত্যেয় অনুসারে অনন্তর প্রত্যেয় বলা হয়৷

অার এই প্রতিসন্ধি চিত্ত যাতে মহা কুশল বিপাক জ্ঞাণ সম্প্রযুক্ত হয় সেকারণে পূর্ব হতেই মরণাসন্ন ব্যক্তির নিকট কোন বিজ্ঞ ভিক্ষু, অভিজ্ঞ উপাসককে ডেকে পাশে বসিয়ে সূত্র দেশনা, পরিত্রান পাঠ, বা ধর্ম দেশনা করাতে হয়৷ মরণাসন্ন ব্যক্তির জন্যে ঐ চিত্তই নির্ধারণ করবে তার অপর যোনির প্রতিসন্ধি৷ তাই চ্যুতি চিত্তের পূর্ব জবন চিত্তসমূহ যাতে মহা কুশল বা তার সাথে জ্ঞাণসম্প্রযুক্ত হয় তার ব্যবস্থা করাটাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ৷

অার তাই, তথাগতের সময়কালে ঘটে যাওয়া এমন অনেক উপমা অাছে, যারা মৃত্যুর পূর্বে অগ্রশ্রাবক সারিপুত্রের নিকট বা মহাশ্রাবকগণদের নিকট ধর্ম শ্রবণ করে মার্গত্ব ও ফলত্ব লাভ করেন৷ এক উপাসক যিনি মৃত্যুর পূর্বে ভিক্ষুর সংঘের নিকট হতে সূত্র শ্রবণের একপর্যায়ে দেবতার উদ্দেশ্যে কোলাহল না করার জন্যে বলেন৷ জল্লাদের ধারাল খর্গের সামনে মৃত্যুর প্রহর গুনা মরণাসন্ন ব্যক্তিকে অায়ুষ্মান সারিপুত্র সয়ং গিয়ে ধর্ম দেশনা করেন৷ অার এই প্রত্যেকটি ঘটনাগুলি দেখলে স্পষ্ট বুঝা যায় যে সত্বার চ্যুতির পূর্বে তাকে তার কৃত পূণ্যকর্মগুলিকে সরণ করিয়ে দেয়া, নির্ভয়তা দেয়াটাই অধিক মহত্ব৷ অার তাই তথাগতের সময়কালে জ্ঞাণী উপাসক উপাসিকাগণ তেমনটাই করত৷
(খুদ্দক নিকায়)

অর্থাৎ, চ্যুতি চিত্ত হওয়ার সাথে সাথেই কষ্মিনকালের ব্যবধানে অপর এক যোনিতে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করায় থেকে যাওয়া চতূর্মহাভূতের এই শবদেহটিকে যে যত যা কিছুই করুক না কেন অপর যোনিতে প্রতিসন্ধি নিয়ে ফেলা সত্বার উপর কোন প্রভাব পরে না(অভিধর্মের দৃষ্টিকোণে)৷

(একটি কাহিনী মনে পরল৷ সাগাইং’এ ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা৷ মেডিকেলে পড়া এক ছাত্র এক সময় দাহক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে৷ ফেরার সময় শ্মসান হতে একটি পূরাতণ অস্থি নিয়ে অাসে৷ এসে পড়ার টেবিলের উপরেই রেখে দেয়৷ পড়তে বসে হাতে নিয়ে দেখতে থাকে৷ হঠাৎ নিয়ে পরে গেল সেটি৷ হাত দিয়ে না নিয়ে পা দিয়েই কুড়ে নিল সেই৷ ঐদিন রাতেই স্বপ্নে কাল অার কুৎসিৎ এক লোক এসে বলল “অামার এতো পছন্দের অস্থিকে তুমি অবমাননা করলে? সাবধান” এই বলেই চলে গেল৷ অাধুনিক যুগের ছেলে, পাত্তাই দিল না৷ পরের দিনও নিচে পরে গেলে একইভাবেই পা দিয়ে তুলে নেয়৷ স্বপ্নে দেখল, গতকালকের লৌকটাই অাসছে৷ এসেই তার গলা ধরে চাপতে শুরু করেছে৷ এমনভাবে চাপছে যেন প্রাণবায়ুটাই বের হয়ে যাবে৷ চোখদুটিও যেন বাইরে এসে যাচ্ছে৷ এমন সময় ত্রিশরণের কথা মনে পরে গেল৷ সেগুলি অাবৃতি করতে ঘর্মাক্ত শরীরে জেগে গেল৷ “অাসলেই কি বাস্তব নাকি স্বপ্ন!” ভেবে গলায় হাত দিয়ে দেখল অাসলেই সত্য৷ গলায় প্রচন্ড ব্যাথা, অার অায়নায় গিয়ে যখন দেখল তখন অারো ভয়ঙ্কর৷)
অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বে যদি শরীরের উপর মায়া থাকে তাহলে ঐ শরীরকে কেন্দ্র করেই প্রেতযোনিতে গিয়ে প্রতিসন্ধি নেয়৷) যে চলে যাওয়ার সে কতো অাগেই চলে গেছে৷

(তথাগতের সময়কালে তথাগত সয়ং কিংবা তাঁর মহাশ্রাবকগণ উপাসকদের দাহক্রিয়া সম্পন্ন করাতেন কি?)
একদিন শাসনা দায়িকা বিশাখা বিহারে এসে তথাগতে সম্মুখে ক্রন্দন করছিল৷ তথাগত প্রশ্ন করলে উত্তরে বলেন তার এক নাতনীর দাহক্রিয়া করে অাসছে৷ অার এই উপমাটি যদি গভীরভাবে লক্ষ্য করেন তাহলেও বুঝতে পারবেন যে, যিনি শাসনের মাতা, সয়ং বিশাখাও তার নাতনীর দাহক্রিয়ায় তথাগত বা তাঁর কোন শ্রাবকগণকে অামন্ত্রন করেননি৷

অার যদি দাহক্রিয়া সম্পর্কে বলতে হয়, তাহলে মহাবগ্গের চীবর খন্ধকটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়ার অনুরোধ রইল৷
অার তাছাড়া বিশুদ্ধি মার্গের পাংশুকুলিক স্কন্দকেও পড়ার অনুরোধ রইল৷

তথাগত সয়ং বা তাঁর সময়কালে ভিক্ষুগণ উৎকৃষ্ট ধূতাঙ্গের জন্যে শ্মসানেই বেশি যেতেন৷ সেখানের মৃত শব দেহ হতেই শেত বস্ত্র সংগ্রহ করে তা বৃক্ষের ছাল হতে রং তৈরী করেই চীবরের কপ্পিয় রংকে গ্রহণ করে চীবর তৈরী করতো৷ অার এই দিক দিয়ে বিবেচনা করলে তথাগতের সময়কালে দাহক্রিয়া করা তেমনটা ছিল না৷ যে যেমনটা পারত তেমনটাই করত৷

দাহক্রিয়ায় কেন ভিক্ষুগণদের যাওয়া উচিত?

দাহক্রিয়ায় ভিক্ষুগণকে এইজন্যে অামন্ত্রন করা হয়, যাতে অনুত্তর পূণ্যক্ষেত্র তথা অনুত্তর ভিক্ষুসংঘকে দানের মাধ্যমে যেই অপরিমেয় কুশল ফল পাওয়া যায় তার ভাগটিকে পরলোকগত সত্বার উদ্দেশ্যে দান করা৷ অার অনুত্তর ভিক্ষুসংঘ পদার্পণ না করা মানে ঐ মহাপূণ্য কর্ম সম্পাদন করতে না পারা৷

ভিক্ষুগণদের কি অবশ্যই যেতে হবে দাহক্রিয়ায়?

যদি গ্রামের কোন শীলবান উপাসক বা উপাসিকা না থাকে তাহলে ভিক্ষুগণকে অবশ্যই যাওয়া উচিত৷ যেহেতু পূণ্যদানের ক্ষেত্রে ছয়টি অঙ্গ অাছে৷ তার মধ্যে একটি হল দুঃশীলদের দ্ধারা দান করা পূণ্যরাশি পরলোকগত সত্বা কখনোই লাভ করতে পারে না৷ এই অঙ্গটি কেবল উপাসক বা উপাসিকাদের জন্য নয়৷ যদি পূন্যরাশি দান করা ভিক্ষুটিও সয়ং দুঃশীল হন তাহলেও পরলোকগত সত্বা এই পূণ্যরাশি লাভে অক্ষম হবেন৷ যদি কোন শীলবান উপাসক বা উপাসিকা থাকে তিনি সয়ং বিহারে এসে সংঘ কর্ম সম্পাদন করে সেই পূণ্যফল দাহক্রিয়ায় গিয়ে দান করতে পারেন৷ অারেকটি হলো পরলোকগত সেই সত্বাকে অামন্ত্রন জানানো৷ অনেকে ভুলবশত অামন্ত্র না জানিয়েই পূণ্যরাশি দান করেন৷ অামন্ত্রন না জানিয়ে যতবারই পূণ্যরাশি দান করা হোক না কেন সে তা লাভ করতে পারে না৷

মায়নমারের কোন কোন জায়গায় দেখা যায়, মৃত ব্যক্তিকে বিহারে নিয়ে অাসেন৷ অতপর সংঘকর্ম বিহারেই সম্পাদন করে ভিক্ষু সয়ং পূণ্যরাশি দান করেন৷ অতপর উপাসকগণ সেই শবদেহ শ্মসানে নিয়ে নিজেরাই দাহ করেন(এই নিয়মটি মন্দ নয়)৷
তাই পুনঃ বলছি, যদি শীলবান কেউ না থাকে তাহলে অবশ্যই ভিক্ষুসংঘকে সেখানে গিয়ে পরলোকগত সত্বাকে পূণ্যরাশির ভাগিদার করা উচিত৷

দাহক্রিয়া অার ভূগর্ভস্থ করার মধ্যে কি পার্থক্য?

এই প্রশ্নের উত্তর মায়ানমারের এক সেয়াড’র কথাই বলব৷ যিনি বিনয়াগুরুকা যিনি বিনয়ে সুদক্ষ, সদাচারী এবং শীলবান তিনি মৃত্যুর পূর্বে বলেছিলেন “অামার মৃত্যুর পর বেশি কিছু লাগবে না৷ দূরে কোন এক জঙ্গলে মাটি চাপা দিলেই হলো৷ এতে অন্তত ভূগর্বে থাকা ছোট কীটের জন্যে কাজেতো অাসবে৷ পুড়িয়ে ফেললে অযথা কাজের বোঝা, লাভও হয় না”
মায়ানমারে এখনো অনেকে ইটের গুহায় রেখে দেয়, কেউ বা পুড়িয়ে ফেলে৷

অার তথাগতের সময়কালে এক ব্রাক্ষ্মণ ছিলেন৷ মৃত্যুর পূর্বে তার ছেলেকে বলে রাখল যাতে মৃত্যুর পর তার শব দেহটি অমুক পাহাড়ে সলিল সমাধিস্থ করে৷ ব্রাক্ষ্মণের মৃত্যুর পর তার ছেলে তাই করতে গেল৷ তথাগতের সম্মুখুন হলে তার পিতার ইচ্ছার বর্ণনা দেয়৷ তথাগত বলেন “এই একই জায়গায় তোমার পিতা পাঁচশতবার সমাধিস্থ হয়েছে৷ তাই পূর্বের কারণে জায়গাটার প্রতি এখনো ইহ জন্মেও অাসক্ত”

অর্থাৎ বুঝাই যায়, কবর দেয়া হয়েছিল৷ অারকেটি হলো কতো জন্ম জন্মান্তর অাপনি কখনো অগ্নির দ্ধারা দাহিত হয়েছে, কখনো বা পাথবীর নিচে সমাধিস্থ হয়েছেন তার কি কোন ইয়ত্বা অাছে?

“পৃথকজন” অর্থ কি?
“নানাসত্থারানং মুখং উল্লোকেন্তীতি পুথুজ্জনা”
—(পতিসম্ভিদামগ্গ পালি)
অর্থাৎ অনন্তর এই সংসারচক্রে নির্দিষ্ট কোন শরণ নেই৷ এই জন্মে এই সৃষ্টি কর্তার শরণ নিল, তো অন্য জন্মে অন্য এক সৃষ্টি কর্তার শরণ নিল৷ কখনো ইন্দ্রকে, কখন ব্রক্ষ্মাকে, কখনো ভূদেবকে, কখনো অগ্নিকে৷

ধর্মপদে তথাগতের একটি গাথার ন্যায়, শত বছর যেই অগ্নির পূজা করেও তিল পরিমান কোন ফল পাওয়া যায় না, তেমনি অসার, চতুর্মহাভূতে তৈরী এই দেহ, যেই দেহ জীবিতিন্দ্রিয়ের চ্যুতির পর অকেজো এক শবদেহ ছাড়া কিছুই নয়, তাকে পুড়ালে মঙ্গল হবে নাকি ভূর্গবস্থ করলে মঙ্গল হবে এমন তর্কে অাছেন৷ তথাগতের ভাষিত দেশিত ৩৮প্রকার মঙ্গল ছাড়া অার কত প্রকার মঙ্গল থাকতে পারে৷
সুতরাং এই পুড়িয়া ফেলা বা কবর দেয়া যার যার ব্যক্তিসত্বার মনের উপরেই নির্ভর করে৷

(বিঃদ্রঃ—তথাগতের সময়কালে মহাপ্রজাপতি গৌতমীসহ অারো অনেককেই অগ্নিদাহ করা হয়েছিল৷ এমনকি তথাগতের পবিত্র দেহকেও)

(দাহক্রিয়ার কারণ যা হতে পারে)
১/তথাগতের বা তাঁর অর্হত শ্রাবকদয়ের দাহক্রিয়া এই জন্যে করা হয় যাতে পবিত্র অস্থিসমূহকে পূণ্যার্থীগণ পূজা সৎকার করে পূণ্যের ভাগিদার হতে পারে৷ অভিধর্মের দৃষ্টিকে চতূর্মহাভূতের তৈরী এই শরীর তূচ্ছ, কিন্তু লৌকিক দৃষ্টিতে এই নশ্বর দেহের উপর অালম্বন করেই পাতিমোক্ষ, ইন্দ্রীয় সংবরনসহ চতুর্পারিশুদ্ধি শীল, উৎকৃষ্ট ধূতাঙ্গশীল পালন করা এই দেহটি দেব মনুষ্যের সকলে পূজ্য হয়ে যায়৷ অার তাইতো পরিনির্বাপিতের পরেও তথাগতের মৃত দেহকে ঘিরে শতকোটি দেবতা ক্রন্দন করেছিলেন৷ অার তাই উত্তম অাচরণকারীদের অগ্নিদাহ করে তাদের অস্থি নেয়া হয়৷ সেই অনুসারে দাহক্রিয়া বৌদ্ধদের পরম্পরা বললেও ভুল হয় না৷ বিমুক্ত সত্বার জন্যে সকল অবস্থাই এক৷ অার তাছাড়া অগ্নিদাহ না করে ভূগর্ভস্থ করা এমনও অনেক ভিক্ষু অাছেন৷ সুতরাং দাহ করা বা সমাধি দেয়া উভয়ই করা যায়৷

২/যশ ও তার বন্ধুদের সম্পর্কে পড়ে থাকবেন সকলে৷ পূর্বকালে শবদেহ পুড়িয়ে যেই অনিত্য জ্ঞাণ লাভ করেছিল ইহজন্মে তার ফলস্বরূপ মোক্ষম লাভ করে৷ অর্থাৎ শব দেহকে ভূগর্বস্থ করার চাইতে অগ্নিদাহ করলে অনিত্য ভাবনার জন্যে অধিক সহায়ক হয়৷ অার একারণেই সম্ভবত তথাগত সকল ভিক্ষুসংঘের অশুভ ভাবনার জ্ঞাণ দেওয়ার জন্যে সিরিমার দেহের দাহক্রিয়া উপস্থিত ছিলেন৷

শেষ কথা এই যে, দাহক্রিয়ায় যদি ভিক্ষুগণ উপস্থিত থাকেন তাহলে ভাল হয়৷ অার যদি না থাকেন তাহলে বিহারে গিয়ে সংঘ কর্ম সম্পাদন করে সেই পূন্যরাশি কোন এক শীলবান উপাসক বা উপাসিকাও সম্পাদন করতে পারেন৷ এই কাজটি অবশ্য করা যায়৷ যেহেতু বর্তমানে বাংলাদেশে শীলবান ও পণ্ডিত উপাসক উপাসিকাগণ গণনাতীত রয়েছেন৷

অার অন্যটি হলো, ভূগর্ভস্থ করার চাইতে অগ্নিদাহ করাটাই অনিত্য ভাবনার জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হওয়ায় সমাধি না দিয়ে অগ্নিদাহ করলে উত্তম হয়৷ এছাড়া বিশেষ কোন কারণ নেই৷

error: Content is protected !!